ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই খুশি। আর ছেলেদের ঈদ মানেই পাঞ্জাবী। ঈদে ছেলেরা আর কিছু কিনুক বা না কিনুক, পাঞ্জাবী অবশ্যই কিনে। শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই পাঞ্জাবী পরে ঈদের নামাযে যায়। একে অন্যকে আলিঙ্গন করে। আনন্দ ভাগাভাগি করে। ঈদের আনন্দ শতগুণ বাড়িয়ে দেয় একটা সুন্দর পাঞ্জাবী । পাঞ্জাবী ছাড়া ছেলেদের ঈদ উৎসব কল্পনা করা যায় না। যুগ যুগ ধরে ঈদের পোশাক হিসেবে পাঞ্জাবী অদ্বিতীয়। ছেলেরা চাতক পাখির মতো ঈদের পাঞ্জাবী কেনার জন্য অপেক্ষা করে। ঈদকে কেন্দ্র করে তাই সরগরম হইয়ে উঠে বাংলাদেশের পাঞ্জাবীর মার্কেট। শুধু কী ঈদ, পাঞ্জাবী ছা রা ছেলেদের যেকোনো উৎসব অসম্পূর্ণ। পাঞ্জাবিতে পুরুষের রুচিবোধ প্রকাশ পায়৷। আসুন তাহলে জেনে নেওয়া যাক, দেশীয় সংস্কৃতিতে কিভাবে এল ঈদের পাঞ্জাবী? পাঞ্জাবী তৈরির ইতিহাস কী? ঈদের পাঞ্জাবীর ধরন কী কী? কোন রঙের ঈদ পাঞ্জাবী বেশি জনপ্রিয়? কোন কাপড়ের তৈরি পাঞ্জাবী পরতে বেশি আরামদায়ক? ঈদের পাঞ্জাবী কেনার ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখা জরুরী?
বাঙালি সংস্কৃতিতে কিভাবে এল ঈদের পাঞ্জাবী?
- প্রাচীনকালে বাঙালি পুরুষ ও রমনীরা সেলাইবিহীন তাঁতের কাপড় পরতো। সময়ের পরিক্রমায় রমনীগণ তাদের পুরুষদের জন্য সেলাই করা জামা বানানো শিখলেন। মধ্যযুগে সুই-সুতা দ্বারা তাঁরা ফতুয়া সদৃশ পাঞ্জাবি বা পীরান সেলাই করতেন। তখন পাঞ্জাবি বা ফতুয়া বা পীরান পুরো হাতে তৈরি হতো। কালে কালে নানা ডিজাইনে জামা বানানো শুরু হলো। নদী তীরবর্তী ও কার্পাস উৎপাদনকারী পার্বত্য অঞ্চলসমূহে এর বিকাশ লাভ সমধিক হওয়ার কারণে পাঞ্জাবি নামাকরণ হয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। প্রাচীন ও মধ্য যুগে আস্তিন কিংবা বোতামের ধারণা ছিল না। তখন ফিতা দিয়ে পাঞ্জাবী বাঁধা হতো। আবার ক্ষেত্রে শুধু গলা দিয়ে ঢুকানো যেতো ও চারপাশে সুই-সুতার কাজ থাকত এমন পোশাক পাঞ্জাবি নামে পরিচিতি লাভ করে।
- পাঞ্জাব অঞ্চলের অধিবাসীদের পরিধেয় পোশাক বর্তমানে পাঞ্জাবী নামে পরিচিত। প্রাচীনকালে তারা হাঁটু পর্যন্ত কাপড় পরতো। স্কার্ফের সাথে আলগা কাপড় পরত আবার কোমরে ধুতি পরতো। আগের সাথে বর্তমান পাঞ্জাবীর সাজসজ্জার ভিন্নতা রয়েছে। কারণ পূর্বে তারা সেলাই করা কাপড়কে অপবিত্র মনে করতো। তাই তারা সেলাইবিহীন সুতি কাপড় গায়ে জড়িয়ে রাখত। তবে কালের বিবর্তনে শুধু কাপড়ের সাথে কাপড় জুড়ে সেলাইটা যুক্ত হয়েছে। সেই সাথে যুক্ত হয়েছে নানানরকম ডিজাইন।
- ভারত ভাগের পরও উভয় বাংলার বাঙালির পাঞ্জাবির নিচের দিকের ঝুল ছিল খাটো। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ লম্বা ঝুলের দিকে নজর দেয়। ১৯৮১-৮২ সালে এই ব্যাপার নিয়ে মোটাদাগে কাজ করে আড়ং। তবে তখন ততোটা বারান হয় নি। পরবর্তীতে ১৯৮৪ সালে আড়ংয়ের ডিজাইনার ঝুল বাড়ানোর ঝুঁকি নিয়ে সফল হন।
ঈদের পাঞ্জাবির ধরনঃ
পছন্দ ও বৈশিষ্ট্যভেদে অনেক ধরনের পাঞ্জাবী দেখা যায় বাজারে। যেমন-
- শেরওয়ানী পাঞ্জাবি
- শর্ট পাঞ্জাবি
- লং পঞ্জাবি
- কাবলি পাঞ্জাবি
- ব্লক বাটিকের পাঞ্জাবি
- কারচুপি পাঞ্জাবি
- জুব্বা পাঞ্জাবি
- নবাব পাঞ্জাবি
- জামদানি পাঞ্জাবি
- ডলার পাঞ্জাবি
কোন রঙের ঈদ পাঞ্জাবী বেশি জনপ্রিয়?
পুরুষেরা পাঞ্জাবি পছন্দের ক্ষেত্রে সাধারণত কালো, সাদা, নীল, মেরুন রঙকেই বেশি প্রাধান্য দেয়। বর্তমানে পাঞ্জাবির রঙ নিয়ে অনেক বেশি নিরীক্ষা করতে দেখা যাচ্ছে। এখনকার তরুণেরা এসব রঙ পছন্দ করেছেন। যা আগে ছিল কল্পনাতীত। মেরুন, বেগুনি, বটল গ্রিন, হলুদ, কালো, বেগুনি, নীল, পেস্ট, বাদামি, চকোলেট, কফি এমন সব রঙ বেছে নেওয়া হচ্ছে।
পাঞ্জাবির রং ও ডিজাইন মূলত নির্ভর করে ব্যক্তির রুচির উপর। কেউ হালকা রঙে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, কেউ আবার বেছে নেন গাঢ় রঙ। তবে ঈদে সাদা রঙের মধ্যে বিভিন্ন কাজের পাঞ্জাবির কদর বহু যুগ ধরে চলে আসছে। রঙ বাঁ ডিজাইন যাই হোক না কেন ঈদ পাঞ্জাবি সবসময়ই উৎসবকে রাঙিয়ে তোলে।
বাঙালি ছেলেদের মনে পাঞ্জাবির যে আবেদন, তা কখনো ফুরিয়ে যাবার মত নয়।
কোন কাপড়ের তৈরি পাঞ্জাবী পরতে বেশি আরামদায়ক?
পাঞ্জাবির কাপড়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু কাপড় হল সুতি, জামদানি, খাদি, মটকা, রাজশাহী সিল্ক, আদি মহিশুর সিল্ক, জয়শ্রী সিল্ক, চিকেন কারি ইত্যাদি।
নববর্ষে ছেলেরা প্রাধান্য দেয় সাদা ও লাল রঙের পাঞ্জাবিকে। বসন্তে হলুদ কিংবা বাসন্তী রঙ, বর্ষা বরনে নীল পাঞ্জাবী। ঈদে বেশি দেখা যায় সাদা রঙের পাঞ্জাবী পরতে। পাঞ্জাবির এই বৈচিত্র্য ও প্রতিটি উৎসবের সাথে মানানসই বৈশিষ্ট্যের জন্য বাঙালি পুরুষের কাছে পাঞ্জাবী এত জনপ্রিয়। তবে বাজারের সব পাঞ্জাবীই পরতে আরামদায়ক নয়। এজন্য ভালো কাপড় নির্বাচন করা জরুরী। সুতি কাপড়ের পাঞ্জাবী সবচেয়ে আরামদায়ক।
ঈদের পাঞ্জাবী কেনার ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখা জরুরী?
পাঞ্জাবি এমন একটি পোশাক যা সব ঋতুতেই মানানসই । ঈদ যেহেতু এক আনন্দঘন দিন তাই ঈদের পাঞ্জাবী হওয়া চাই স্পেশাল। বর্তমানে ঈদের পাঞ্জাবি কেনার ক্ষেত্রে কিছু বিষয় খেয়াল করা উচিত-
- কাপড় নরম ও আরামদায়ক।
- কাপড় সুতির হলে সবচেয়ে ভালো।
- বাতাস চলাচল করতে পারে এমন কাপড় বেছে নিন।
- পছন্দ অনুযায়ী হ্যান্ডি কটন, সিল্ক, এসবও রাখা যায়।
- ব্যক্তিত্ব অনুযায়ী পছন্দসই রঙ বেছে নিন।
- হলুদ এবং লাল রঙ এড়িয়ে চলতে পারেন। যেহেতু ধর্মীয় বিধিনিষেধ আছে।
- জামদানি পাঞ্জাবীর ক্ষেত্রে অথেনটিক জামদানি বেছে নিন।
- মেশিনে তৈরি জামদানি কাপড় পরিহার করুন।
- সুতি পাঞ্জাবির মধ্যে হাতের কাজ করা পাঞ্জাবি বেছে নিতে পারেন।
- জমকালো ভাব না চাইলে ডলার কাপড়ের তৈরি পাঞ্জাবী এড়িয়ে চলতে পারেন ।
- চিকেন কারী পাঞ্জাবী নিতে চাইলে কাপড় পাতলা নাকি ভারি দেখে নিন।