খেজুর একটি সুমিষ্ট শক্তিবর্ধক ফল। মহান আল্লাহ তা’আলার অশেষ নেয়ামত খেজুর। রাসুলুল্লাহ(সঃ) বলেছেন, “তোমাদের কেউ রোজা রাখলে খেজুর দিয়ে যেনো ইফতার করে। খেজুর না পেলে পানি দিয়ে, নিশ্চয়ই পানি পবিত্র”-(আহমদ, তিরমিজি, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ)। অন্য একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ(সঃ) বলেছেন, “ ইমানদার ব্যাক্তির জন্য খেজুর দিয়ে সেহরি খাওয়া কতই না উত্তম”। – (আবু দাউদঃ ২৩৪৫)। মধ্যপ্রাচ্যে খেজুরকে “ ট্রি অফ লাইফ” বলা হয়ে থাকে। সৌদি আরবে প্রায় ৩৬০ প্রজাতির প্রায় আড়াই কোটি খেজুর গাছ রয়েছে। বিশ্ব খেজুর উৎপাদনে প্রথম অবস্থানে রয়েছে মিশর, দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সৌদি আরব , এবং তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ইরান। দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র দেশ হিসেবে ৬ষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে পাকিস্তান। খেজুর রপ্তানিতে প্রথম অবস্থানে আছে সৌদি আরব। বিশ্বব্যাপী প্রায় ৯০ লক্ষ টন খেজুর প্রতি বছর উৎপাদিত হয়। মোট চারটি উপায়ে খেজুর সংরক্ষণ করা হয়। সেগুলো হলোঃ কাচা অবস্থায়, পূর্ণাঙ্গ অবস্থায়, পাকা-নরম অবস্থায়, এবং পাক-রোদে শুকানো অবস্থায়।
খেজুর কি আসলেই শক্তি বাড়ায়?
খেজুরে রয়েছে গ্লুকোজ যা তাৎক্ষণিকভাবেই দ্রুত শক্তি বৃদ্ধি করে। বিশেষ করে রোজার মাসে ইফতারে খেজুর খেলে সারাদিনের ক্লান্তি নিমিষেই দূর হয়ে যায়। খেজুরে থাকা ফ্রুকটোজ শরীরে সুগার লেভেল বাড়ায়। খেজুরে রয়েছে উচ্চমাত্রার শর্করা, প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, ও ক্যালরি। এছাড়াও খেজুরে রয়েছে ভিটামিন এ, বি১, বি২, বি৩, বি৫, আয়রণ, ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ইত্যাদি। খেজুরের ডায়েটারি ফাইবার থাকে যা উচ্চ রক্তচাপ কমায়। খেজুর মানুষের শরীরের প্রায় ১১ ভাগ আয়রণ ঘাটতি পূরণ করে। প্রতি ১০০ গ্রাম খেজুরে রয়েছে ক্যালরি ২৮২ গ্রাম, প্রোটিন ২ গ্রাম, কার্বোহাইড্রেট ৭৫ গ্রাম, এবং ডায়েটারি ফাইবার ৮ গ্রাম। খেজুরে রয়েছে জিক্সাথিন ও লিউটেন নামক উপাদান যা চোখের দৃষ্টিশক্তি বাড়ায় ও রেটিনা ভালো রাখে।
কোন খেজুরের গুনাগুন কেমন?
পৃথিবীতে নানা প্রজাতির অসংখ্য খেজুর রয়েছে। বাংলাদেশেও নানা ধরনের খেজুর পাওয়া যায়। বাংলাদেশে পাওয়া খেজুরগুলোর মধ্যে জনপ্রিয় ১০ টি খেজুর হলোঃ
- আজোয়া।
- মারিয়াম।
- মাবরুম।
- বারহি।
- মেডজুল।
- সুক্কারি।
- আম্বার।
- সাফাওয়ি।
- সাগাই।
- খুদরি।
চলুন জেনে নেই এই জনপ্রিয় ১০ টি খেজুরের গুনাগুন
আজোয়া খেজুর
এটিকে জান্নাতের ফল বলা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ(সঃ) এই খেজুর খুব পছন্দ করতেন। নবীজী(সঃ) বলেছেন, “ যে ব্যাক্তি প্রতিদিন সকালে সাতটি আজওয়া(উৎকৃষ্ট) খেজুর খাবে, সেদিন কোনো বিষ বা জাদু তার ক্ষতি করবে না”- (বুখারি, হাদিসঃ ৫৪৪৫)। আজোয়া খেজুরের বৈশিষ্ট্য ও গুনাগুন হলোঃ
- দেখতে কালো ও মাঝারি আকৃতির।
- হৃদরোগীদের জন্য বিশেষ কার্যকরী। এছাড়াও হৃদরোগ ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমায়।
- হজমশক্তি বৃদ্ধি করে।
- পাকস্থলীর রোগ প্রতিরোধ করে।
- দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি করে।
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
- শুষ্ক কাশি, শ্লেষ্মা, কফ, ও অ্যাজমায় কার্যকরীভাবে কাজ করে।
- ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ায়।
- স্নায়বিক ও স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি করে।
- ফুসফুস ও মুখগহবরের ক্যান্সার প্রতিরোধ করে।
- গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দূর করে।
- রক্তস্বল্পতা দূর করতে সাহায্য করে।
- প্রসবের সময় মাংসপেশীর দ্রুত সংকোচন ও প্রসারণ ঘটায়। প্রসব দ্রুত হতে সাহায্য করে।
- প্রসবের পর রক্তক্ষরণ কমিয়ে দেয়।
- কোষ্টকাঠিন্য দূর করে।
- খারাপ কোলেস্টেরল থেকে দূরে রাখে। কোলেস্টেরল কমায়।
- হাড়ের ক্ষয় রোধ করে।
- দাত, নখ, ও মাড়িকে ভালো রাখতে সাহায্য করে।
মারিয়াম খেজুর
- লালচে বাদামী এবং লম্বাটে।
- পানিশূন্যতা দূর করে।
- শক্তি বৃদ্ধি করে।
- গ্লুকোজের ঘাটতি পূরণ করে।
- রক্তশূন্যতা দূর করে।
- অ্যাজমা প্রতিরোধে কার্যকরী।
- ঠান্ডার সমস্যা ও এলার্জি প্রতিরোধ করে।
- কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখে।
- খাবারের অরুচি দূর করে।
- হাড় ও দাতের মাড়ি মজবুত করে।
- প্রচুর ভিটামিন-এ এবং ভিটামিন-সি রয়েছে।
- দৃষ্টিশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে।
মাবরুম খেজুরের গুনাগুন
- ক্লান্তি দূর করে।
- লালচে বাদামী ও মাঝারি লম্বাটে আকৃতির।
- উচ্চ রক্তচাপ কমায়।
- কোষ্টকাঠিন্য দূর করে।
- হৃদস্পন্দর স্বাভাবিক রাখে।
- হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।
- রেটিনা ও দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখে।
- রক্তস্বল্পতা দূর করে।
- ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়।
- প্রচুর পরিমাণে ফাইবার থাকে যা পাকস্থলী ভালো রাখে।
বারহি খেজুর
এটি জর্ডান থেকে আসে। একে বড়ই খেজুরও বলা হয়ে থাকে। বারহি খেজুরের গুনাগুন হলোঃ
- ছোট ও গোলাকার।
- বাদামী ও হলদেটে রঙের।
- এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ ফাইবার, আয়রণ, পটাশিয়াম, ও ক্যালসিয়াম।
- কাঁচা ও পাকা উভয় অবস্থায়ই খাওয়া যায়।
মেডজুল খেজুর
- নরম ও আঠালো ধরনের।
- দেখতে গাঢ় বাদামি রঙের।
- প্রচুর পরিমাণে আয়রন, ক্যালসিয়াম, ও ভিটামিন রয়েছে।
- হৃদপিন্ডের কার্যক্ষমতা বাড়ায়।
- রক্তপ্রবাহ সচল ও স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।
- রক্তস্বল্পতা কমায়।
- এতে প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে যা শরীরকে ক্ষতিকারক ফ্রি র্যাডিকেল থেকে সুরক্ষিত রাখে।
- উচ্চ রক্তচাপ কমায়।
- প্রচুর ফাইবার থাকে যা কোষ্টকাঠিন্য দূর করে।
- কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে।
- ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়।
সুক্কারি খেজুরের গুনাগুন
- নরম এবং হলদেটে সোনালী বর্ণের।
- ছোট এবং খুবই মিষ্টি।
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
- গর্ভবতী মায়েদের নরমাল ডেলিভারী হতে সাহায্য করে।
- প্রসবকালীন মৃত্যু ঝুঁকি কমায়।
- রক্তশূন্যতা কমায়।
- কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে।
- কিডনি ও লিভার ভালো রাখে।
- ক্যান্সার প্রতিরোধ করে। বিশেষত ফুসফুস, ব্রেস্ট, কোলন ও অগ্নাশয়ের ক্যান্সার প্রতিরোধে কার্যকরী।
- খাবারে রুচি বাড়ায়।
- ত্বক ভালো রাখে।
- হজমশক্তি বৃদ্ধি করে।
আম্বার খেজুর
- আনবারা নামে অধিক পরিচিত।
- তুলতুলে নরম ও মাংসল।
- দেখতে গাঢ় লাল বর্ণের ও মাঝারি আকৃতির।
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
- উচ্চ রক্তচাপ কমায়।
- প্রচুর ফাইবার থাকে যা কোষ্টকাঠিন্য দূর করে।
- আয়রণের ঘাটতে কমায়।
- হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক রাখে।
সাফাওয়ি খেজুরের গুনাগুন
- মদিনাতে জন্মায়।
- দেখতে মারিয়াম খেজুরের মত।
- গাঢ় কালচে বাদামী বর্ণের।
- খালি পেটে খেলে পাকস্থলীর জীবাণু ধ্বংস করে।
- উচ্চমাত্রার মিনারেল রয়েছে।
- গর্ভবতী মায়েদের নরমাল ডেলিভারী হতে সাহায্য করে।
- কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে।
- ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়।
- ত্বক ভালো রাখে।
- ফুসফুস, ব্রেস্ট, কোলন ও অগ্নাশয়ের ক্যান্সার প্রতিরোধে কার্যকরী।
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
- রক্তশূন্যতা দূর করে।
- উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে।
সাগাই খেজুর
- সুগাই নামেও পরিচিত।
- গোড়ার দিকে সোনালী ও বাকি অংশ বাদামী বর্ণের হয়।
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
- কোষ্টকাঠিন্য দূর করে।
- হৃদস্পন্দর স্বাভাবিক রাখে।
- প্রচুর পরিমাণে ফাইবার ও ভিটামিন থাকে।
- হালকা মিষ্টি ও ক্রিস্পি।
- কোলেস্টেরল মুক্ত।
- উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে।
- ডায়াবেটিক নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
- খালি পেটে খেলে পাকস্থলীর জীবাণু ধ্বংস করে।
খুদরি খেজুরের গুনাগুন
- ধমনী পরিষ্কার রাখে।
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
- উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে।
- গাঢ় বাদামী বর্ণের।
- মসৃণ ও নরম।
- সহজেই পরিপাকযোগ্য।
- কোষ্টকাঠিন্য দূর করে।
- হৃদরোগ ও ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়।
- কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে।
- রক্তশূন্যতা দূর করে।
- প্রচুর পরিমাণে আয়রন, ক্যালসিয়াম, ও ভিটামিন রয়েছে।
- মূত্রথলির ইনফেকশন দূরে রাখে।
খেজুর শরীরের জন্য ভীষণ উপকারী। শুধু রোজার মাসেই না বরং সারাবছর খেজুর খেলে অসংখ্য রোগ থেকে সুরক্ষিত থাকা সম্ভব। খেজুর শক্তিবর্ধক হিসেবে কাজ করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। তাই সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য খেজুর আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় রাখা উচিত।