ত্বকের যত্নে কোরিয়ান প্রোডাক্ট -যেভাবে পাবেন গ্লাস স্কিন 

বর্তমানে জনপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছে গ্লাস স্কিন। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এই গ্লাস স্কিন পেতে মরিয়া। চকচকে গ্লাস স্কিন এখন হালের অবসেশন। রুপচর্চার এই ধারাটি এসছে কোরিয়ানদের কাছ থেকে।   কে-পপ আর কে -ড্রামার জনপ্রিয়তার সাথে সাথে বাংলাদেশে কোরিয়ান স্কিনকেয়ার  প্রোডাক্ট ব্যবহারের হার বেড়েছে। সবাই এখন সুন্দর হতে চায়। সুন্দর ত্বকের জন্য এজন্য তরুণ তরুণীরা বেছে নিচ্ছেন কোরিয়ান প্রোডাক্ট। রূপচর্চায় কে বিউটি এক নতুন সম্ভাবনা। বিশ্বজুড়ে স্কিন কেয়ারে সবচেয়ে বেশি হাইপ তুলেছে কোরিয়ান বিউটি, যাকে সংক্ষেপে কে-বিউটি বলে। কোরিয়ান পণ্যের এত হাইপ কেননা এসব পণ্য ত্বককে করে তোলে চকচকে মসৃণ ও গ্লাসি। কোরিয়ানরা মুক্তার মতো উজ্জ্বল ত্বকের জন্য চাল ধোঁয়া পানি টোনার হিসেবে কাজ করে। আপনিও কী পেতে চান কোরিয়ানদের মতো গ্লাসি স্কিন? তাহলে আসুন জেনে নিই গ্লাস স্কিন কী? কেন কোরিয়ান প্রোডাক্ট ব্যবহার করবেন? কোরিয়ান প্রোডাক্টের প্রাকৃতিক উপাদান কী কী থাকে? কোরিয়ান রূপচর্চার পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিন।

কোরিয়ান গ্লাস স্কিন বলতে কী বুঝায়?

জিনগত কারণে একেক দেশের মানুষের স্কিন একেক রকম। এছাড়া আবহাওয়ার একটা প্রভাব তো থাকেই। কোরিয়া, হংকং, চীনের লোকদের জিনগত বৈশিষ্ট্যের কারণে ত্বকের টেক্সচার ভিন্ন হয়। রূপচর্চায় এখন দারুণ জনপ্রিয় কোরিয়ান স্কিনকেয়ার রুটিন। গ্লাসের মতো চকচকে, স্বচ্ছ, উজ্জ্বল ত্বক বলা হয় কোরিয়ান গ্লাস স্কিন।  এতে ত্বক হয় মসৃণ। ত্বকে আলোর প্রতিফলন ঘটে কাচের মতোই। এমন ত্বক পেতে আপনাকে অবশ্যই ফলো করতে হবে কোরিয়ান রীতিনীতি। কোনোরকম মেকআপের কারসাজি নয়, ত্বকের যত্ন এখানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ববহ। 

ত্বকের যত্নে কোরিয়ান প্রোডাক্ট কেন ব্যবহার করবেন

ত্বকের যত্নে কোরিয়ান প্রোডাক্ট কেন ব্যবহার করবেন?

জিনগত তফাতের কারণে একদম কোরিয়ানদের মতো স্কিন পাওয়াটা দুর্লভ। তবে তাঁদের কাছাকাছি স্কিন পাওয়া যায় প্রতিনিয়ত যত্ন নিলে। কোরিয়ান স্কিন কেয়ার পুরো বিশ্বে এখন তুমুল জনপ্রিয়। কোরিয়ান প্রোডাক্টের কেন এত হাইপ, ত্বকের যত্নে কেন কোরিয়ান প্রোডাক্ট ব্যবহার করবেন সে সম্পর্কে জেনে রাখা ভালো। 

  • কোরিয়ান স্কিন কেয়ার প্রোডাক্টের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হচ্ছে সিরাম ও সানস্ক্রিন।
  • এছাড়াও রয়েছে স্কিনকেয়ারের যাবতীয় পণ্য। যেমন- লোশন, ময়েশ্চারাইজার, টোনার ইত্যাদি। 
  •  সব প্রোডাক্ট প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে তৈরি।  
  • প্রাকৃতিক উপাদান ত্বকের বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দূর করে । 
  • কোনোরকম ক্ষতিকারক পদার্থ থাকে না। 
  • নিয়মিত যত্ন নিলে ত্বক সতেজ ও মসৃণ হবে। 
  • ত্বক ভেতর থেকে আর্দ্র হয়ে উঠে। 
  • ত্বকের ব্লেমিশ ও স্পট দূর করে। 

কোরিয়ান প্রোডাক্টের প্রাকৃতিক উপাদানঃ 

কোরিয়ান প্রোডাক্টের উল্লেখযোগ্য দিক হলো প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে তৈরি। কোরিয়ান স্কিনকেয়ার পণ্যে কী কী প্রাকৃতিক উপাদান থাকে আসুন জেনে নিই। 

রাইস ওয়াটারঃ

চাল ধোঁয়া পানিকে বলা হয় রাইস ওয়াটার। এই পানি স্কিন কেয়ারে ব্যবহার করছে কোরিয়ানরা। কারণ রাইসে আছে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট, ভিটামিন এ, সি, ই ও মিনারেলস। এটি টোনার হিসেবে ভালো কাজ করে। এটি ত্বকের হাইপার পিগমেন্টেশন কমায়। ত্বকের ব্লেমিশ কমায় এবং স্কিনকে ময়েশ্চারাইজ করে স্কিনের উজ্জ্বলতা বাড়িয়ে দেয়। 

গ্রিন টিঃ

গ্রিন টি  শুধু পানীয় হিসেবেই উপকারী নয়। স্কিনের জন্য এটি বেশ কার্যকরী। এটি একটি পাওয়ারফুল অ্যান্টি ইনফ্ল্যামেটরি। ব্রণের প্রবণতা কমায়। সূর্যের ক্ষতিকর তাপ থেকে রক্ষা করে। ইরিটেশন ও সান ড্যামেজ কমায়। ত্বকের তারুণ্য ধরে রাখে। গ্রীন টি ভিটামিন-ই ও L Theanine অ্যামাইনো এসিডের ভালো উৎস। 

থানকুনিঃ

থানকুনি এই ছোট ভেষজ গাছটি অনেকেই সালাদ হিসেবে খায়। তবে ত্বকের যত্নেও এটি কার্যকরী। থানকুনি পাতার রস খুব উপকারী। এতে আছে হাইড্রেটেটিং, সুদিং, হিলিং, অয়েল কনট্রোল ও অ্যান্টি এজিং প্রোপার্টিজ। 

স্নেইল মিউসিনঃ

শামুকের শরীর থেকে নিঃসৃত হওয়া হাই গ্লাইকোসাইলেটেড প্রোটিন, যাতে আছে স্নেইল মিউসিন নামক উপাদান। এতে বিদ্যমান ন্যাচারাল প্রোটিন স্কিনের কোলাজেন ও ইলাস্টিন বাড়িয়ে দেয়। এছাড়াও গ্লাইকোলিক অ্যাসিড এক্সফোলিয়েন্ট হিসেবে কাজ করে। ড্রাই স্কিনকে ময়েশ্চারাইজ করে। 

ক্লেঃ 

কোরিয়ান পদ্ধতিতে ত্বকের যত্নে ক্লে’র ব্যবহার খুব জনপ্রিয়। ডিপ ক্লিনজিং এর জন্য ক্লে ব্যবহার করা হয়।  ক্লে আপনার ত্বককে গভীরভাবে পরিষ্কার করে। ক্লে-এর বিভিন্ন ধরন বাজারে পাওয়া যায়, যেমনঃ বেনটোনাইট, কেওলিন,রেড ক্লে ইত্যাদি। এর মাঝে বেনটোনাইট ও কেওলিন ক্লে বেশ পরিচিত। ড্রাই বা সেনসিটিভ স্কিনের জন্য কেওলিন ক্লে, অন্যদিকে তৈলাক্ত ত্বকের জন্য বেনটোনাইট ক্লে ভালো।

কোরিয়ান রূপচর্চার পদ্ধতি

কোরিয়ান রূপচর্চার পদ্ধতি 

সুন্দর, চকচকে, গ্লাস স্কিন পেতে নিয়মিত ত্বকের যত্ন নিতে হবে কোরিয়ান ধারা অবলম্বনে । কোরিয়ান স্কিনকেয়ার প্রোডাক্ট ব্যবহার করে কিভাবে  রূপচর্চা করবেন সে সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক-

অয়েল ক্লিনজার

ত্বক পরিষ্কার রাখতে কোরিয়ানরা প্রথমে উপযোগী তেল ম্যাসাজ করেন স্কিনে। এরপর ওয়াটার বেসড কোনো ক্লিনজার দিয়ে মুখ ধুয়ে নেন। কোরিয়ানদের দুই বার ত্বক পরিষ্কার করার পদ্ধতিকে বলা হয় ডাবল ক্লিনজিং। এর প্রথম ধাপ হচ্ছে অয়েল ক্লিনজিং। ঘরে থাকা যেকোনো তেল দিয়ে ত্বক পরিষ্কার করতে পারেন। ভিটামিন ই-সমৃদ্ধ সয়াবিন তেল বা সরিষার তেলও ব্যবহার করা যাবে। সবচেয়ে ভালো নারকেল বা জলপাইয়ের তেল। এ ধাপে মুখে তেল খুব ভালোভাবে মেখে নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, তেল ম্যাসাজ করতে হবে আপার স্ট্রোকে। অর্থাৎ নিচে থেকে ওপরে। পাঁচ মিনিট। এরপর একটা সুতি কাপড় বা তুলার প্যাড হালকা কুসুমগরম পানিতে অল্প ভিজিয়ে মুখ থেকে তেল মুছে ফেলতে হবে। আপনি চাইলে ওয়েট টিস্যুও ব্যবহার করতে পারবেন। এভাবে মুখের মেকআপ, আটকে থাকা বাইরের ধুলা-ময়লা, অতিরিক্ত সিবাম, সবকিছু পরিষ্কার করা যায়। 

ওয়াটার বেজড বা প্রাকৃতিক ক্লিনজার

ত্বক পরিষ্কারের জন্য অয়েল  ক্লিনজারের পর ওয়াটার বেজড ক্লিনজার ব্যবহার করা হয়। এতে করে ত্বকে লুকিয়ে থাকা অবশিষ্ট ধুলো, ময়লা দূর হয়ে যায়। এটি ত্বকের গভীরে গিয়ে পরিষ্কার করে। সাধারণত এ ধাপে নিজের ত্বকের ধরন অনুযায়ী ফেস ওয়াশ ব্যবহার করা হয়। আপনি চাইলে ঘরেই প্রাকৃতিক ক্লিনজার বানিয়ে নিতে পারেন। মধু, টক দই, ওট মিল্ক ক্লিনজার হিসেবে খুবই ভালো উপাদান। মুলতানি মাটি, চন্দনের প্যাক, গোলাপজল এসবও ভালো  প্রাকৃতিক ক্লিনজার । 

এক্সফোলিয়েটর 

ত্বকের মৃত কোষ দূর করতে এক্সফোলিয়েটর ব্যবহার করতে হয়। এতে রোমকূপ পরিষ্কার হয়।  সপ্তাহে দুদিনের বেশি ত্বকে এক্সফোলিয়েটর প্রয়োগ করা উচিত নয়। ঘরে এটি বানানো খুবই সহজ। চিনি বা কফির সঙ্গে যেকোনো তেল মিশিয়ে ত্বকে ব্যবহার করা যায়। মুখে ভালোভাবে কিছুক্ষণ ম্যাসাজ করতে হবে। তারপর নরমাল পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে।

টোনার 

ডাবল ক্লিনজিং ও এক্সফোলিয়েশনের পর ত্বক স্বাভাবিকভাবেই শুষ্ক হয়ে যায়। ত্বকের আর্দ্রতা ফিরিয়ে আনতে টোনার ব্যবহার করতে হয়। এতে স্কিনের ভেতর রক্ত সঞ্চালন বাড়ে।  এটি ত্বকের পিএইচ ব্যালান্স ঠিক রাখে। টোনার হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন শসার রস, গোলাপজল, চাল ধোয়া পানি, বেদানার রস, আপেল সাইডার ভিনেগার ইত্যাদি। বাড়তি উপকারের জন্য  ভিটামিন ই ক্যাপসুল মিশিয়ে নিতে পারেন। 

সিরাম

সিরামকে বলা হয় ত্বকের ওষুধ। সিরাম বলিরেখা দূর করে। ত্বককে অরে তোলে মসৃণ ও উজ্জ্বল।  ত্বকের সমস্যার ধরন বুঝে সিরাম ব্যবহার করতে হবে। তৈলাক্ত ত্বকের জন্য শসার রস, লেবুর রস খুব ভালো কাজ করে। ত্বকে ব্রন বা র‍্যাশ দেখা দিলে নিমপাতার রস, হলুদের রস, গোলাপজল ব্যবহার করুন। শুষ্ক ত্বকের যত্নে অ্যালোভেরা জেল নিয়ম মেনে লাগাতে পারেন। বলিরেখার সমস্যা থেকে রেহাই পেতে শসার রস, বেদানার রস, ভিটামিন ই ক্যাপসুল ব্যবহার করুন। 

এসেন্স

কোরিয়ান স্কিন কেয়ারে এসেন্স খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। এসেন্সের প্রধান কাজ এটি ত্বককে আর্দ্র করে।  ভেতর থেকে উজ্জ্বল করে। 

শিট মাস্ক

ত্বকের আর্দ্রতার জন্য কোরিয়ানদের মাঝে শিট মাস্কের ব্যবহার বেশ জনপ্রিয়। শিট মাস্ক ব্যবহারে দ্রুত আর্দ্রতা পাওয়া যায়। কাঙ্ক্ষিত ফলাফলের জন্য সপ্তাহে দুই থেকে তিনদিন ব্যবহার করুন এই শিট মাস্ক।

আই ক্রিম 

চোখের নিচের ত্বকের জন্য দরকার বাড়তি যত্ন। কারণ এটি ত্বকের সবচেয়ে শুষ্ক অংশ। চোখের নিচের কালো দাগ, ফোলা ভাব, বলিরেখা কমানোর জন্য আই ক্রিম ব্যবহার করা উচিত সবার। এক চামচ অ্যালোভেরা জেল, এক চামচ অলিভ অয়েল বা নারকেল তেল, হাফ চামচ গ্লিসারিন, একটা ভিটামিন ই ক্যাপসুল এবং একটা প্রিমরোজ অয়েল ক্যাপসুল মিশিয়ে বানিয়ে ফেলুন ঘরোয়া আই ক্রিম।

সানস্ক্রিন 

স্কিনকেয়ারের সর্বশেষ ধাপ হলো সানস্ক্রিন ব্যবহার। সুর্যের অতি বেগুনি রশ্মির  থেকে ত্বককে রক্ষার জন্য সানস্ক্রিন ব্যবহার করা জরুরী। সানস্ক্রিন ব্যবহারে ত্বক রোদে পুড়ে যায় না। বিশেষ করে  ঘর থেকে বাহিরে গেলে সানস্কিন লাগাতে হবে।  

ফেসিয়াল হেয়ার রিমুভ

কোরিয়ানদের মতো স্কিন পেতে হলে মুখের ত্বকের হেয়ার রিমুভ করা আবশ্যক।

গ্লাস স্কিন পেতে সাপ্তাহিক যত্ন

গ্লাস স্কিন পেতে সাপ্তাহিক যত্নঃ

রোজকার স্কিনকেয়ার রুটিন মেনে ত্বকের যত্ন তো করতেই হবে। এর বাইরেও সাপ্তাহিক বন্ধের দিন বাড়তি যত্ন নিতে হবে। সপ্তাহের একটা দিন ভাতের মাড়ের প্যাক লাগাতে পারেন। গ্লাস স্কিন পেতে ভাতের মাড়ের প্যাক সবেচেয়ে ভালো। প্যাক তৈরির জন্য ভাতের মাড় চুলায় জ্বাল দিয়ে নিন। খুব ঘন হয়ে এলে নামিয়ে ঠান্ডা করে ছেঁকে নিন। এই প্যাক লাগানোর পর শুকিয়ে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। এরপর পানি দিয়ে মালিশ করে করে সরিয়ে ফেলুন শুকিয়ে যাওয়া প্যাক।

আসুন একনজরে দেখে নিই কার্যকরী কোরিয়ান স্কিনকেয়ার প্রোডাক্ট-