‘কালো যদি মন্দ তবে কেশ পাকিলে কাঁদ কেনে? কালো কেশে রাঙা কুসুম হেরেছ কি নয়নে?’-এই লাইনগুলো থেকেই বুঝা যায় চুল কতটা অর্থবহ। ছেলেদের সৌন্দর্যবর্ধনে চুল অপরিহার্য। অধিকাংশ ছেলেরা ত্বকের পাশাপাশি চুলের যত্নেও উদাসীন। সপ্তাহে নিয়মকরে তেল দিতে অনীহা। শ্যাম্পুর পর কন্ডিশনার ব্যবহার করতে ছেলেদের খেয়াল থাকে না। অনেকেই শুধু শ্যাম্পু করাকেই চুলের যত্ন করা বুঝেন। বেশিরভাগ ছেলেরা আলসেমি করে চুলের যত্ন নিতে চান না। অথচ পরে আফসোস করেন । একটু সচেতন আর মিনিট দশেকের যত্নে আপনার মাথার চুলও হতে পারে আকর্ষণীয় ও ঝলমলে। গরমে বাইরে ধূলোবালি বেশি থাকে। ছেলেদের ঘামও বেশি হয়। সবমিলিয়ে গরমকালে ছেলেদের চুলের খুব বাজে অবস্থা হয়। ঘামের সাথে ময়লা জমে মাথায় খুশকি দেখা যায়। ছেলেদের চুল পড়া, চুল রুক্ষ হয়ে যাওয়া এসব খুব কমন সমস্যা। আসুন তবে জেনে নিই, গরমে ছেলেদের চুলের যত্ন কিভাবে করবেন? খুশকি কিভাবে দূর করবেন? কেন হেয়ার প্যাক ব্যবহার করবেন? চুল সুন্দর রাখতে যে বিষয়গুলোর দিকে খেয়াল রাখবেন, এইসব সম্পর্কে।
গরমে ছেলেদের চুলের যত্নঃ
সব ছেলেরাই কমবেশি চুল পড়া সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, রাত জেগে ফেসবুকিং, মুভি-সিরিজ দেখা, অনিয়মিত ঘুম, টেনশন ইত্যাদি নানা কারণে ছেলেদের চুল নিয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হয়। কার অকালে টাক পড়ে। কারো আবার খুশকি আর রুক্ষতা থেকে রেহাই মিলে না। ছেলেদের উচিত চুলের যত্ন নেয়া। এই যত্নে খুব বেশি সময় কিন্তু লাগে না, শুধু সদিচ্ছা দরকার। গরমকালে চুলের আলাদা যত্নের দরকার হয়। কেননা তখন ধূলোবালি, ঘাম, প্রখর রোদের কারণে ছেলেদের চুলের অবস্থা হয় তথৈবচ। গরমে যেভাবে চুলের যত্ন নিবেন-
- বাইরে থেকে এসে বিশ্রাম নিয়ে চুল ভালোমতো ধুয়ে নিতে হবে।
- সপ্তাহে অন্তত দুইদিন শ্যাম্পু করতে হবে।
- শ্যাম্পুর পর অবশ্যই কন্ডিশনার ব্যবহার করতে হবে।
- সপ্তাহে অন্তত দুই দিন তেল দিতে হবে।
- নারকেল, জলপাই , আমন্ড, কালোজিরা, মেথির তেল চুলের যত্নে ব্যবহার করা যায়।
- তেলের সাথে পিঁয়াজ, লেবু, আমলকীর রস মিশিয়ে নিতে পারেন।
- ৪ থেকে ৬ সপ্তাহ পরপর চুল ট্রিম করা।
- গরমে চুল ছোট রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ।
- সপ্তাহে একদিন হেয়ার প্যাক লাগান।
- সারাদিনে পরিমাণমতো পানি খাওয়া।
চুল পড়া সমস্যায় কী করবেন?
প্রতি দশজনের প্রায় চারজন চুল পড়ার সমস্যায় জর্জরিত। ছেলেদের জন্য চুল পড়া রোধ করা এক চ্যালেঞ্জ। তবে কথায় আছে আগে দর্শনধারী পরে গুণ বিচারী, তাই নিজেকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করার জন্য চুলের যত্ন নিতে হবে। নইলে কিছুদিন পরপর ভিন্ন ভিন্ন হেয়ারস্টাইল করা যাবে না। এখন জেনে নিই, চুল পড়া রোধ করতে কী করণীয়-
পেঁয়াজের রসঃ
পেঁয়াজের রস চুল নরম রাখতে সাহায্য করে৷ চুল পড়া রোধে পেঁয়াজের রস খুব কার্যকরী।
- এতে রয়েছে সালফার, যা চুল ভেঙে যাওয়া ও পাতলা হওয়া রোধ করে।
- নতুন করে চুল গজাতে সাহায্য করে।
- পেঁয়াজের রস চুল পেকে যাওয়ার সমস্যা প্রতিরোধ করতে পারে।
- সপ্তাহে দুই থেকে তিনবার যেকোনো তেলের সঙ্গে মিশিয়ে পেঁয়াজের রস ব্যবহার করতে হবে।
আমলকীর রসঃ
আমলকীর রস চুল পড়া সমস্যায় খুব কাজে দেয়। আমলকির রস তেলের সাথে মিশিয়ে ম্যাসাজ করতে হবে।
- একটি স্টিলের বাটিতে নারিকেল তেল অথবা অলিভ অয়েল নিয়ে একটা কাঁচা আমলকি কেটে মিশিয়ে নিতে হবে।
- চুলার ওপর একটা কাপড় দিয়ে ধরে কিছুক্ষণ গরম করে নিয়ে কিছুক্ষণ রেখে দিন।
- কুসুম গরম থাকতে চুলের আগায়-গোড়ায় ভালোভাবে আঙুল দিয়ে ম্যাসাজ করতে হবে।
খুশকি কিভাবে দূর করবেন?
ছেলেদের চুলের খুশকি হওয়ার প্রবণতা অনেক বেশি। গরমে চুলের গোড়া ঘেমে যায়।এছাড়া তৈলাক্ত চুল প্রচুর ময়লা টানে৷ এতে করে গরমে খুশকি বেশি হয়। খুশকির সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে হেয়ার প্যাক ব্যবহার করা উচিত।
মেহেদি ও টক দইয়ের প্যাকঃ
গরমে চুলের যত্ন নিতে মেহেদি ও টক দইয়ের প্যাক খুশকি দূর করতে সাহায্য করে। টক দই, মেহেদি পাতা, মেথি গুঁড়ো ও লেবুর রস একসঙ্গে মিশিয়ে প্যাক তৈরি করে নিন। এরপর চুলে ৩০ মিনিটের মতো লাগিয়ে শ্যাম্পু করুন। টক দই চুলকে ময়েশ্চারাইজ করবে। মেথি গুঁড়ো খুশকি দূর করে এবং লেবুর রস চুল ঝলমলে করবে।
লেবুর রসের প্যাকঃ
তিন চামচ লেবুর রসের সঙ্গে এক চা-চামচ তেল মিশিয়ে চুলের গোড়ায় ১০ মিনিট ম্যাসাজ করুন৷ সম্ভব হলে সপ্তাহে প্রতিদিন এই ম্যাসাজ নেওয়ার চেষ্টা করুন৷ ম্যাসাজ শেষে ভালো করে চুল ধুয়ে নিন৷ প্রতিদিন শ্যাম্পু না করলেও চলবে৷ লেবুব রস চুলের গোড়ার তৈলাক্ততা দূর করে৷ যে কারণে চুলের গোড়ায় ঘাম কম হয়৷
টি ট্রি অয়েলঃ
টি ট্রি অয়েল অনেক শক্তিশালী অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ও অ্যান্টিইনফ্ল্যামেটরি উপাদান থাকে। এটি খুশকি প্রতিরোধের ক্ষমতা রাখে। নারকেল বা অন্য যেকোনো তেলে কয়েক ফোঁটা টি ট্রি অয়েল মিশিয়ে সপ্তাহে দুই দিন ব্যবহার করুন।
এছাড়া খুশকি দূর করতে অলিভ অয়েলের প্যাক, তেঁতুল গোলানো পানিও কার্যকরী।
অ্যালোভেরার প্যাকঃ
- গরমে চুলের যত্ন নিতে অ্যালোভেরার প্যাক ভালো কাজে দেয়।
- অ্যালোভেরা মাথা ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করবে এবং চুল পড়া কমাবে।
- অ্যালোভেরার রস লাগিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে চুল পরিষ্কার করে ফেলুন।
- ঘৃতকুমারীর রস, মেথি গুঁড়ো ও ত্রিফলা (আমলকী, হরীতকী ও বহেরা ভেজানো পানি) একসঙ্গে মিশিয়ে প্যাক তৈরি মাথার স্ক্যাল্পে লাগাতে পারেন।
কলা ও আমলকীর প্যাকঃ
- গরমে রোদে পোড়া লালচে চুলের জন্য কলা ও আমলকীর প্যাক খুব উপকারী।
- পাকা কলা, আমলকীর রস, মধু এবং মেথি গুঁড়ো একসঙ্গে মিশিয়ে প্যাক তৈরি করে চুলে লাগাতে পারেন।
- এটি চুল নরম এবং রোদে পুড়ে লালচে হওয়া থেকে রক্ষা করবে।
ডিমের মাস্কঃ
- চুলের স্বাস্থ্যের জন্য ডিম খুবই উপকারী।
- এতে রয়েছে সালফার ও প্রোটিন, যা চুলের ফলিকল মজবুত করে ও নতুন চুল গজাতে ভূমিকা রাখে। সপ্তাহে অন্তত একবার চুলের ডিমের মাস্ক ব্যবহার করতে পারেন।
- চুলের গোড়া শক্ত হওয়ার পাশাপাশি চুল ঝলমলে ও নরম হবে।
যারা সবসময় ব্যস্ত থাকেন তাদের জন্য ঘরে বসে প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে প্যাক তৈরি করাটা ঝামেলার। কর্মব্যস্ত ছেলেরা বাজারে পাওয়া যায় এমন ভালো ব্র্যান্ডের হেয়ার প্যাক ব্যবহার করতে পারেন। আসুন একনজরে দেখে নিই কয়েকটি ভালোমানের হেয়ার প্যাক-
ছেলেদের চুল সুন্দর রাখতে যে বিষয়গুলোর দিকে খেয়াল রাখা জরুরীঃ
নিয়মিত চুলের যত্ন নিতে হবে। ফেসবুকিং কিংবা ইন্সট্রাগ্রাম, ভিডিও গেমসে অতিরিক্ত সময় ব্যয় না করে চুলের যত্নে একটু সময় দেওয়া উচিত প্রতিটি যুবকের। ছেলেদের চুল সুন্দরে রাখতে কিছু বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি, যেমন-
- চুল অতিরিক্ত পরিষ্কার না করা।
- সপ্তাহে দুই বা তিনবার কিংবা এক দিন পরপর শ্যাম্পু করাই যথেষ্ট।
- অন্যদিন পানি দিয়ে পরিষ্কার করলে চলবে।
- স্ক্যাল্পের ধরন বুঝে শ্যাম্পু নির্বাচন করুন।
- সালফেটমুক্ত শ্যাম্পু এবং সিলিকনমুক্ত কন্ডিশনার ব্যবহার করুন।
- মাইল্ড ও অয়েল ফ্রি কন্ডিশনার বেছে নিন।
- কন্ডিশনার যেন কখনো চুলের গোড়া বা স্ক্যাল্পে না লাগে সেদিকে খেয়াল রাখবেন।
- হেয়ার ক্রিম বা জেলের বদলে অ্যালোভেরা জেল ব্যবহার করুন।
- শক্ত করে চুল না বাঁধা যাবে না। বা ক্যাপ না পরা।
- ক্যাপ খুব শক্ত করে পরা যাবে না।
- লম্বা চুল যাঁদের আছে, তাঁরা শক্ত করে পনিটেইল করা পরিহার করুন।
- দিনে বেশ কয়েকবার মোটা চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়ানোর অভ্যাস করা।
- চুল ধোঁয়ার সময় গরম পানি ব্যবহার করা যাবে না।
- লবণাক্ত পানি ও ক্লোরিনযুক্ত সুইমিংপুলের পানি প্রিহার করতে হবে।
- চুলের সুস্থতায় ডায়েট অনেক জরুরি।
- মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, শাকসবজি, বাদামের মতো পুষ্টিকর খাবার রোজকার খাদ্যতালিকায় রাখা উচিত।
- অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করা যাবে না।
- নিয়মিত আট ঘণ্টা ঘুমাতে হবে।
- ধূমপান পরিহার করতে হবে।