অসহ্য গরমে স্বস্তি দেয় ঠাণ্ডা পানীয়। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহে কমবেশি সবারই ডিহাইড্রেশন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ড্রিহাইড্রেশন দূর করতে বেশি করে পানি, শরবত পান করা উচিত। এতে শরীর দুর্বল হবে না। গরমেও আরাম লাগবে, কাজে মনোযোগ দেওয়া যাবে। গরমকালে সুস্থ থাকতে তাই ফলের রস, লেবু-জলের শরবত, কাঁচা আম কিংবা পাকা তেঁতুলের শরবত, ডিটক্স ওয়াটার খাওয়া উচিত। শুধু সুস্থ দেহ নয়, সুন্দর ত্বকের জন্যও পানীয় দরকারী। বর্তমানে এটি খুবই জনপ্রিয় একটা পানীয়। তবে অনেকেই জানেন না ডিটক্স ওয়াটার কী? বাড়িতে কীভাবে বানাবেন ডিটক্স ওয়াটার? কোন নিয়মেই বা পান করবেন এই পানীয়? আপনাদের এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে এই লেখাতে।
ডিটক্স ওয়াটার কী?
ডিটক্স ওয়াটার একটি পানীয় যা বিভিন্ন ধরনের ফল, আদা, লেবু সহযোগে তৈরি করা হয়। শরীর থেকে বাড়তি দূষিত উপাদান বের করে দেওয়ার জন্য ডিটক্স পানি পান করা হয়। এটি সাধারণ পানির বিকল্প একটা পানীয়। খুব সহজে তৈরি করা যায় এই অসাধারণ গুণ সম্পন্ন পানীয়। একজন সুস্থ মানুষ প্রতিদিন আড়াই লিটার ডিটক্স ওয়াটার পান করতে পারেন । বিভিন্ন ধরনের ডিটক্স ওয়াটার বানানো যায়। যেমন- শসা, ডাব, জিরে-মৌরী, আপেল,তরমুজের ডিটক্স ওয়াটার।
কেন ডিটক্স করবেন?
আমাদের নানা ধরনের ভুল খাদ্যগ্রহণ, অধিক তেল-মসলা খাওয়ার কারণে শরীর ও পেটে সৃষ্টি হয় নানা ধরনের সমস্যা। সেই সঙ্গে শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ে। রাতে ঘুমাতে কষ্ট হয়। সকালে ঘুম থেকে উঠতেও কষ্ট হয়। খাওয়ার পর পেট ফুলে যায়, ক্ষুধামান্দ্য দেখা দেয়। রুচি নষ্ট হয়। সারা দিন ঝিমুনি লাগে। পেট পরিষ্কার হয় না। একাধিক বার টয়েলেটে যেতে হয়। ওজন বেড়ে যায়, চেহারায় কালো ছাপ পড়তে থাকে। ঘুম থেকে উঠলে মুখ থেকে দুর্গন্ধ বের হয়। এমন সমস্যা যাদের আছে, তারা ডিটক্স ওয়াটারে লাভবান হবেন।
ডিটক্স ওয়াটারের উপকারিতা কী কী?
ডিটক্স ওয়াটার বহুগুণে গুণান্বিত। এটি শুধু তৃষ্ণা মেটায় না, দেহের ওজন কমাতেও ভূমিকা রাখে। এছাড়া শারীরবৃত্তীয় বিভিন্ন কাজে এর অবদান আছে। আসুন জেনে নিই ডিটক্স ওয়াটারের উপকারিতা সম্বন্ধে-
- দেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রা বজায় রাখে।
- দূষিত বর্জ্য শরীর থেকে প্রসাবের সাথে বের করে দেয়।
- মুখের দূর্গন্ধ দূর করতে দারুণ ভাবে কাজ করে।
- খালি পেটে খেলে গ্যাস্ট্রিক আলসারের ঝুঁকি কমায়।
- ভিটামিন সি, মিনারেল ও ফাইবারের ঘাটতি পূরণ হয়।
- পানি স্বল্পতা দূর হয়।
- ক্লান্তিভাব দূর করে।
- ত্বক উজ্জ্বল হয় এবং জেল্লা বাড়ে।
- চুল ও মুখের ত্বক সুরক্ষিত রাখে ।
- দেহকে চাঙ্গা করে তুলে।
- হজমে সহায়তা করে।
- অতিরিক্ত ক্ষুধা ভাব কমায়।
- ওজন কমাতে সাহায্য করে।
- শরীরের ইমিউনিটি বাড়বে।
- রক্তে কোলেস্ট্ররলের মাত্রা কমবে।
- ইউরিন ইনফেকশনের ঝুঁকি কমায়।
ডিটক্স ওয়াটারের উপকরণঃ
- ১টি মাঝারি সাইজের লেবু
- আদা ২ ইঞ্চি, স্লাইস করে কেটে নেওয়া
- শসা
- মৌসুমী বিভিন্ন ধরনের ফল
- এক চা-চামচ মধু
- ১০-১২টি পুদিনাপাতা
- বিশুদ্ধ পানি
ডিটক্স ওয়াটার তৈরি করার নিয়মঃ
- একটি জগের মধ্যে এক লিটার পানি (কাচের জগ হলে ভালো), পাঁচ থেকে ছয় টুকরা লেবু (পাতলাভাবে গোল করে কাটা), পুদিনাপাতা ছয় থেকে সাতটি, মধু এক টেবিল চামচ বা দুই চা–চামচ (খাঁটি হতে হবে), শসা তিন থেকে চার টুকরা দিয়ে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা কাচের জারে ভিজিয়ে রাখতে হবে।
- প্রথমে সমস্ত উপকরণ প্রস্তুত করে জগের মধ্যে দিয়ে দিন ।
- তারপর জগে এক লিটার একদম পরিস্কার খাওয়ার পানি ঢেলে দিন ।
- এবার উপরে ঢাকনা দিয়ে একঘন্টার মতো রেখে দিন ।
- এক ঘন্টা পর যখন আপনার পানি খেতে মন চাইবে তখন এই পানি পান করুন।
- পানি শেষ হয়ে গেলে আবার জগে পানি ভর্তি করে রেখে দিন।
- ভিজিয়ে রাখা পানি সারা দিন অল্প অল্প পান করবেন।
বিকল্প উপায়ঃ
- পানিতে শসা ব্যবহারসহ অন্যান্য মৌসুমি ফল ব্যবহার করা যাবে। এতে পানি পান করা সহজ হবে এবং কোনো অনিহা থাকবে না।
- আপনি আপনার পছন্দ মত যেকোন ফল যেমন: মালটা, কমলা, জাম্বুরা, তরমুজ, আঙ্গুর, স্ট্রবেরি, আনারস দিয়ে বানিয়ে নিতে পারেন।
- এক লিটার পানিতে পাঁচ থেকে ছয় টুকরা লেবু, এক টেবিল চামচ অ্যাপল সিডার ভিনেগার ও এক টেবিল চামচ বা দুই চা–চামচ মধু মিশিয়ে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা কাচের জারে ভিজিয়ে রাখতে হবে।
- দারুচিনি গুঁড়ো ও পাতলা স্লাইস করা আপেল যোগ করতে পারেন।
- ২ থেকে ৩ পিস মাল্টা, ২ টেবিল চামচ জাম্বুরা, ৮ থেকে ১০টি পুদিনাপাতা, গোল করে কাটা কয়েক টুকরা লেবু সারা রাত পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। প্রয়োজনে ফ্রিজে রাখতে পারেন।
- এক গ্লাস পানিতে তিন চা চামচ আস্ত জিরা রাতে ভিজিয়ে রাখুন। সকালে জিরাসহ পানিটা সিদ্ধ করে নিন। এতে একটা লেবুর রস মিশিয়ে নিন। এবার চায়ের মতো করে পান করুন।
ডিটক্স ওয়াটার পান করার নিয়মঃ
- প্রতিদিন ঘুম থেক উঠে খালি পেটে কিংবা রাতের খাবারের ১ ঘণ্টা পর ।
- দিনে ২-৩ বার পান করা যায়।
- সারা দিন কোনো সলিড খাবার না খেয়ে শুধু এ ডিটক্স ওয়াটার দুই ঘণ্টা পরপর রাত আটটা পর্যন্ত পান করে থাকা; আর সেদিন অন্য কোনো কিছু না খেয়ে রাতে ঘুমিয়ে পড়া। পরের দিন সকালে অনুভব করতে পারবেন শরীর হালকা হয়ে গেছে। এ উপায়ে সপ্তাহে একদিন করে ৬ সপ্তাহ ডিটক্স করা যেতে পারে।
ডিটক্স ওয়াটার বানাতে যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখবেনঃ
- সারারাত পানিতে ফল ভিজিয়ে পান করবেন না এতে পানিতে ব্যাকটেরিয়া জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
- পানিতে ফল ভিজিয়ে রেখে তা পান করতে চাইলে ৩-৪ ঘণ্টার মধ্যে পান করতে হবে।
- পানিতে ফল, সবজি পচে যাওয়ার ভয় এড়াতে পানীয়টি ফ্রিজে রেখে রেখে সারাদিনে আপনাকে সবটুকুই খেয়ে নিতে হবে।
- পরের দিনের ডিটক্স ওয়াটার বানাতে আগের দিনের পানিতে আবার পানি যোগ করলে কোন উপকারই হবে না। তাই এই পানীয়টি বানাতে প্রতিদিনই আপনাকে নতুন পানিতে নতুন ফল যোগ করতে হবে।