রমজান মাসের ইফতারিতে ছোলা- পিঁয়াজু কোথা থেকে এলো?

মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের কাছে রমজান হচ্ছে সিয়াম-সাধনা, সংযমের মাস। সারাবছর ধরে মুসলিমরা রমজান মাসের অপেক্ষায় থাকে। সারাদিন রোজা রাখার পরে ইফতার দিয়ে রোজা ভাঙা হয়। পবিত্র রমজান মাসের সাথে নামায, রোজা, সেহরী, ইফতার এই শব্দগুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাঙালি খুব ভোজনরসিক জাতি হিসেবে পরিচিত। ইফতারে কেউ পছন্দ করে হালকা জাতীয় খাবার। যেমন- লেবুর শরবত, খেজুর, দই-চিড়া, ঘোল, লাবাং, বিভিন্ন ধরনের ফল ইত্যাদি। আবার কেউ বিরিয়ানী, হালিম, টিক্কা মাসালা, কাবাব, নান, দইবড়া, শরবতে মোহাব্বতী, জিলাপী পছন্দ করেন। তবে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের কাছে রমজান মাসের ইফতারি মানেই ছোলা-পিয়াজু-আলুরচপ-বেগুনি, ঘুগনি। কেউ এতে যোগ করেন বুন্দিয়া কিংবা জিলাপী। স্বাদ বাড়ানোর জন্য দেওয়া হয় পিঁয়াজ ও কাঁচামরিচ কুচি, ধনেপাতা, পুদিনাপাতা। সাধারণ মানুষের ইফতারিতে এত সমাদৃত ছোলা-পিয়াজু কিন্তু বাঙালির নিজস্ব খাবার নয়। তাহলে আসুন জেনে নিই, ইফতার শব্দের অর্থ কী? বাঙালির ইফতারিতে কিভাবে এল ছোলা-পিঁয়াজু? খেজুর কিভাবে যুক্ত হলো ইফতারিতে? উনিশ শতকে আমাদের ইফতার কেমন ছিল?

ইফতার শব্দের অর্থ কী

ইফতার শব্দের অর্থ কী? 

ইফতার শব্দটি এসেছে  আরবি ﻓﻄﺮ ফাতর থেকে। ‘ইফতার’ শব্দের অর্থ হলো, ভঙ্গ করা,ছিঁড়ে ফেলা, রোযা ত্যাগ করা। অর্থাৎ ইফতার অর্থ রোযা ত্যাগ করার বা ছাড়ার জন্য খাদ্য গ্রহণ করা। আরবি শব্দ ‘ইফতার’ মানে – রোযা ত্যাগ করা। অর্থাৎ ইফতার অর্থ রোযা ত্যাগ করার বা ছাড়ার জন্য খাদ্য গ্রহণ করা। 

হিজরি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, রমজান হলো সবচেয়ে পবিত্র মাস। এই মাসে বিশ্বের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা মাসব্যাপী রোজা রাখেন। পূণ্য অর্জন ও আত্মশুদ্ধির আশায় সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত তারা পানাহার থেকে বিরত থাকেন। মাগরিবের আজান শুনে মুখে খাবার তুলে রোজা ভাঙ্গেন। রোজা ভাঙ্গার এই সময়কে বলা হয় ‘ইফতার’। অনেক দেশে এটি ‘ইফতর’ নামেও পরিচিত।  ইফতার শেষে  মাগরিবের নামাজ।

খেজুর যেভাবে যুক্ত হলো ইফতারিতে

রমজান মাসের ইফতারি খেজুর যেভাবে এলো?

সুনান আবূ দাউদের ২ খন্ডের কিতাবুস সিয়ামের ২৩৪৯ নং হাদীস থেকে জানা যায়, রাসূল (সঃ)

ইফতারীতে উত্তম খেজুর খেতেন। তিনি ভালো মানের খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন। যদি তিনি টাটকা খেজুর না পেতেন তাহলে শুকনো খেজুর খেতেন। টাটকা খেজুর খাওয়া সবচেয়ে ভালো। আপনি যদি টাটকা খেজুর না পান তাহলে শুকনো খেজুর দিয়ে ইফতার করুন। আর যদি তাও না পান তাহলে পানি দিয়ে ইফতার করুন, এটাই সুন্নাত।

সপ্তম শতকে ইসলাম ধর্ম আরব দেশ থেকে প্রসার লাভ করে অন্যান্য দেশে। ওই সময়ে হজরত মুহাম্মদ (সা.) ইফতারি হিসেবে খেজুর ও পানি খেতেন। বাংলাদেশের মুসলমানেরাও ইফতারে খেজুর রাখেন।

রমজান মাসে অনেকে একসঙ্গে বসে ইফতার গ্রহণ করাই নিয়ম। খেজুর খাবার মাধ্যমে ইফতার শুরু করাই প্রথা। তবে অনেক জায়গায় জল পান করে ইফতার শুরু হয়। কোথাও আবার ভেজা চাল মুখে দিয়ে ইফতার শুরু করার প্রথা প্রচলিত রয়েছে।

বাঙালির রমজান মাসের ইফতারি ছোলা-পিঁয়াজু কিভাবে এলো?

বাঙালি সংস্কৃতিতে ইফতারির সময় কয়েকশো বছর আগেও এরকম ভাজাপোড়া খাওয়ার উল্লেখ পাওয়া যায় না। কয়েকশো বছর আগেও এগুলো ইফতারি খাদ্যতালিকায় ছিল না। আমাদের ইফতারে যেসব খাবার খাওয়া হয়, তার বড় অংশটি এসেছে পার্সিয়ান বা মুঘল খাবারের তালিকা থেকে। এক সময় মুঘলরা ভারতবর্ষ শাসন করতো। তারা যখন ঢাকা শাসন করেছেন। তাদের সেই খাদ্য তালিকা তখনকার ঢাকার লোকজন গ্রহণ করেছে। তাদের কাছ থেকে সেটা আস্তে আস্তে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে বলে ।

ছোলাঃ

ছোলা হলো আফগানী জনপ্রিয় খাবার। ছোলা আফগানদের কাছ থেকে ভারতবর্ষে আসে। এরপর বাংলাদেশের মুসলমানরা গ্রহণ করেছে। তাঁরা কাবুলি চানা বা কাবুলি ছোলা খেয়ে থাকে। সেখান থেকেই ছোলা খাওয়ার চল এসেছে।  

ভারত বা বাংলাদেশে এতে আরও মশলা, পেঁয়াজ ইত্যাদি দিয়ে মুখরোচক করা হয়। ছোলার সাথে মুড়ি খাওয়ার চলও এই অঞ্চলের মানুষের নিজস্ব উদ্ভাবন।

পিঁয়াজু, বেগুনি, চপঃ

পিঁয়াজু, আলুর  চপ,  উত্তর ভারত থেকে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন এলাকার খাবারে ছড়িয়ে পড়েছে। 

এই অঞ্চলে ইসলাম ছড়ানোর সময় অ্যারাবিক প্রভাব ছিল। পার্সিয়ান প্রভাব ছিল, পরবর্তীতে সেটা একপ্রকার ভারতীয়করণও হয়। ভারতে এসে, মূলত উত্তর ভারত থেকে ইফতারের সময় মুখরোচক খাবারের অংশ হিসাবে নানা রকমের ভাজাপোড়া খাওয়ার চল যোগ হয়েছে। তখন পেঁয়াজু, আলুর চপ, খাওয়ার চল যুক্ত হলো। এই সব খাবারের ধারায় বাঙালি নিজের বুদ্ধিমত্তায় বানিয়েছে বেগুনি। এ ছাড়া চালের তৈরি নানা পদ, যেমন খই, মুড়ি, চিড়া বাঙালির খাদ্যতালিকায় বহু যুগ ধরেই চলমান। রোজার দিনে একসময়ে পানিতে চাল ভিজিয়ে রাখা হতো। সাধারণ মুসলমানেরা সেই চাল মুখে দিয়ে রোজা খুলতেন। তবে ছোলা-মুড়ি-পেঁয়াজু একসঙ্গে মাখিয়ে খাওয়ার  প্রবণতা বাংলার নিজস্ব মানুষের উদ্ভাবন।

মুড়ির সাথে ছোলা-মুড়ি-পেঁয়াজু-জিলাপী

মুড়ির সাথে ছোলা-মুড়ি-পেঁয়াজু-জিলাপীঃ

মুড়ির সঙ্গে ছোলা-মুড়ি-পেঁয়াজু ইত্যাদি, এমনকি জিলাপী ভেঙে মাখিয়ে খাওয়ার ধরনটি চলছে ১৫০-২০০ বছর ধরে। এই খাবারটি পুরান ঢাকা থেকে সারা দেশে ছড়িয়েছে। ধারণা করা যায়, হতদরিদ্র মানুষ বিভিন্ন জায়গা থেকে হরেকরকম ইফতারি পেতেন। এরপর একসঙ্গে ভেঙে মিশিয়ে কয়েকজন ভাগ করে খেতেন।

উনিশ শতকে আমাদের ইফতার কেমন ছিল

উনিশ শতকে আমাদের রমজান মাসের ইফতারি কেমন ছিল? 

উনিশ শতকে শবেবরাতের পর থেকেই শুরু হয়ে যেত রমজানের আয়োজন। নতুন মাটির শরা, হুঁকো কেনা হতো। পানির পাত্রগুলো ধুয়ে মুছে তৈরি করা হতো পানীয় সংরক্ষণের জন্য। গরমের দিনে পানি ঠান্ডা রাখার জন্য আনা হত বালুর তৈরি সুরাহি। পানিকে সুগন্ধি করার জন্য যোগ করা হতো গোলাপ ও কেওড়া। সে সময় ইফতার করাকে বলা হত ‘রোজা খোলাই’। জোহরের পর থেকেই রোজা ভাঙার আয়োজন করা হতো। 

  • আগে থেকে ভেজানো থাকতো ছোলা, মুগডাল।  বাড়ির মেয়েরা ডাল বেঁটে তৈরি করা হত ফুলুরি। 
  • আজান শোনার পর ইফতার শুরু হত জমজম কূপের পানি মেশানো শরবত দিয়ে। 
  • শরবতের মধ্যে থাকত তোকমা, বেলের, বেদানার, লেবু ও তেঁতুলের শরবত। তোকমার শরবতের মধ্যে জনপ্রিয় ছিল “তাখসে রায়হান”।
  • শরবতের পর সওয়াবের কাজ হিসেবে খোরমা খাওয়া হত।
  • এর পর ইফতারের মূল পর্ব শুরু হতো।  
  • পরিবারের ছোট-বড় সবাই হাজির হতেন দস্তরখানায়।
  • ঘরে বানানো মুড়ির বিভিন্ন পদ, মিষ্টি ও নোনতা সমুচা, কাঁচা ও ভাজা ডাল, ফল-ফলারি, পেঁয়াজু, ফুলুরি প্রভৃতি বাজার থেকে কিনে আনা হত। 
  • ‘গোলাপি ঊখরা’ নামের মিষ্টি মিশ্রিত এক ধরনের খাবার ছিল জনপ্রিয়। । 
  • ভুনা চিঁড়া, দোভাজা, টেপি ফুলুরি, মাষকলাইয়ের বড় ডাল-বুট, বাকরখানি, কাবাব ইত্যাদি জায়গা পেত।  
  • ঐতিহ্যবাহী খাবারের তালিকায় থাকতো সুতলি কাবাব, নারগিসি কোফতা, শাহি জিলাপি ইত্যাদি।
  • গোলাপপানি আর কেওড়াতে ভিজিয়ে রাখা হতো আখের ছোট ছোট কাটা টুকরা। ইফতারের পর সবার মুথে থাকত এই আখের টুকরা।

রমজান মাসে ইফতারের সময় যা খাওয়া হয়, বছরের অন্যান্য সময়ে কিন্তু তা খাওয়া হয় না। একটু লক্ষ্য করলে দেখবেন ইফতারের মূল পদগুলো নানান দেশ বা অঞ্চল এর খাবার। যা  পরবর্তীতে আমাদের খাবারে নিজস্ব পদ হিসেবে মিশে গেছে। খেজুর মধ্যপ্রাচ্যের ফল, সুন্নত হিসেবে তা মুসলিম আচার রমজানের ইফতারে চলে এসেছে। ছোলা মূলত আফগানদের প্রিয় খাবার, আফগানদের হাত ধরেই এর প্রবেশ হয়েছে উপমহাদেশে। ইফতারে নানান সুগন্ধীযুক্ত এবং স্বাদের শরবতের আগমন মধ্যপ্রাচ্য হতে এসেছে।  উত্তর ভারত থেকে এসেছে আলুচপ, বেগুনি, পেঁয়াজু এগুলোর চল।