পবিত্র রমজান মাসে রোজা রাখা কবে থেকে ফরয হয়েছিলো? রোজার ইতিহাস কি? কোন নবীর আমলে রোজা ফরয হয়েছিলো? রোজা কি? রোজার নিয়ত করার নিয়ম কি? ইহুদী ও শিয়ারাও কি রোজা রাখে? রমজান মাস কেনো এত ফজিলতপূর্ণ? রমজানে রোজা রাখার প্রকৃত নিয়ম কি? রোজার ইতিহাস সম্পর্কে বিভিন্ন আলেমে-দ্বীন ও ইসলাম বিশেষজ্ঞরা মতবাদ দতেছেন। তবে পবিত্র গ্রন্থ আল-কোরআনে রোজার আদেশ সম্পর্কে সুষ্পষ্ট বর্ণনা দেয়া আছে। রমজান মাসে রোজা ফরজ হওয়ার আগেও পূর্ববর্তী নবীগন রোজা পালন করতো। রমজান মাসের মাহাত্ন্য ও গুরুত্ব ইসলামে অধিক তাৎপর্যপূর্ণ কেননা এই পবিত্র মাসেই নাযিল হয়েছিলো সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ আল-কোরআন। চলুন জেনে নেই রোজার ইতিহাস, রোজা কি? রোজার সঠিক নিয়ত কিভাবে করতে হয়? রোজা রাখার সঠিক নিয়ম, শিয়া ও ইহুদীরা কিভাবে রোজা রাখে? কেনো শিয়া ও ইহুদীদের রোজা রাখার নিয়ম ভিন্ন?
রোজা কি?
সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার, পাপাচার, যাবতীয় খারাপ কাজ, যৌনাচার, স্বামী-স্ত্রীর সঙ্গম, মেলামেশা, ও খারাপ চিন্তা থেকে নিজেকে বিরত থাকাই রোজা। রোজা মূলত ফারসি শব্দ। আরবীতে একে সিয়াম বলা হয়। মহানবী হযরত মুহম্মদ(সঃ) মদীনায় ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে হিজরতের দিন থেকে হিজরি সাল গণনা শুরু হয়। দ্বিতীয় হিজরী সালের শাবান মাসে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন রোজা ফরজ ইবাদত হিসেবে পালন করার আদেশ দেন। সিয়াম সাধনা মানুষকে পাপাচার ও পার্থিব কামনা থেকে মুক্ত রাখে। রমজানের শেষ ১০ দিনের যেকোনো বেজোড় রাতেই রয়েছে হাজার মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ রজনী লাইলাতুল কদর। মহান আল্লাহ এই মাসেই পবিত্র কোরআন নাযিল করেছেন। সাওম অর্থাৎ রোজা হচ্ছে ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ।
রোজার ইতিহাস কি?
রোজা কবে থেকে শুরু? রোজা কবে থেকে ফরয করা হয়েছিলো? নিশ্চয়ই জানতে চান রোজার ইতিহাস সম্পর্কে? মুসলিমদের আদি পিতা আদম (আঃ) নিষিদ্ধ ফল খেয়ে পৃথিবীতে আসার পর আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। ৩০ দিন পর্যন্ত তার দোয়া কবুল হয়নি। অনেকের ধারণা সেজন্যই আদম সন্তানেরা ৩০ টি রোজা রাখতেন। তবে রোজার আদেশ মহান আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারাতে আয়াত হিসেবে নাজিল করেন। আল্লাহ বলেছেন, “ তোমরা যারা ঈমান এনেছো, তোমাদের ওপর রমজানের রোজা ফরজ করা হলো। যেমন ফরজ করা হয়েছিলো তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পারো”- (সুরা বাকারাঃ আয়াত ১৮৩)। কোরআনের এই আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় রোজার আদেশ সম্পর্কে এবং পূর্ববর্তী নবীগনও রোজা রাখতেন। তবে পূর্বরর্তী নবীগণের ক্ষেত্রে রমজান মাসের মতো ৩০ টি রোজা ফরজ করা হয়নি।
রোজা কবে থেকে ফরয করা হয়েছিলো?
সুরা বাকারার আয়াত থেকে জানা যায় পূর্ববর্তী নবীগণ ও রোজা রাখতেন। হযরত মুসা(আঃ) ৩০ টি রোজা রাখার পর তুর পাহাড়ে আল্লাহ তাকে আরো ১০ টি রোজা রাখার আদেশ দেন। ঈসা(আঃ) এবং ইদ্রিস(আঃ) ও রোজা রাখতেন। হযরত দাউদ(আঃ) একদিন পরপর রোজা রাখতেন অর্থাৎ তিনি বছরে ৬ মাস রোজা রাখতেন। হযরত নূহ (আঃ) শাওয়াল মাসের ১ তারিখ এবং জিলহজ্ব মাসের ১০ তারিখ ব্যাতীত প্রতিদিন রোজা রাখতেন। আরবের মানুষেরা বিশেষত মদীনায় মহররমের ১০ তারিখ অর্থাৎ পবিত্র আশুরার দিন রোজা রাখতেন। তবে রমজানের রোজা ফরজ করা হয় হিজরী দ্বিতীয় সনের শাবান মাসের ১০ তারিখে। মহানবী(সঃ) তার জীবদ্দশায় নয়টি বছর রমজানের রোজা রেখেছেন। কেননা হিজরি ১১ তম সালের রবিউল আউয়াল মাসে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। রোজা ফরযের পূর্বে মহররমের ১০ তারিখ অর্থাৎ আশুরার দিন এবং আইয়্যামে বিজ অর্থাৎ প্রতি চন্দ্রমাসের ১৩, ১৪, ও ১৫ তারিখে রোজা রাখার প্রচলন ছিলো। রমজানের রোজা ফরজের আদেশ আসার পর উক্ত দিনগুলোতে রোজা নফল হয়ে যায়।
ইহুদী ও শিয়ারাও কি রোজা রাখে?
ইহুদীরা মূলত ইসারাইল জাতির অন্তর্ভুক্ত এবং এদেরকে বনী ইসরাঈল বলা হয়ে থাকে। যাকোব বা ইসরাইল এর বারোটি পূত্রের নামে বনী ইসরাঈলের বারোটি গোষ্ঠীর নামকরণ করা হয় যাদের মধ্য থেকে একটি ছিলো ইয়াহুদা। মুলত এই ইয়াহুদা থেকে ইহুদী নামটি এসেছে। অপরদিকে শিয়ারা হচ্ছে সেইসব মুসলমান যারা বিশ্বাস করে যে মুহম্মদ(সঃ) এর মৃত্যুর পর আলী(রাঃ) ও তার বংশধরেরাই মুসলিম উম্মাহর একমাত্র দাবিদার। শিয়া সম্পরদায় মহানবী(সঃ) এর সময়ে এবং তার ইন্তিকালের পরে হযরত আলী(রাঃ) কে তাদের খলিফা ও ইমাম মনে করতো। ইহুদী ও শিয়ারাও রোজা রাখে তবে তারা সুন্নী সম্প্রদায় ও মহানবী(সঃ) এর দেখানো পদ্ধতি অনুসারে রোজা রাখে না। ইতিহাস থেকে জানা যায় ইহুদীরা ৪০ দিন, খ্রিষ্টানরা ৫০ দিন ও শিয়ারা ৩০ দিন রোজা রাখতো। তবে শিয়ারা ৩০ দিন রোজা রাখলেও তারা সুন্নতি পন্থা মেনে রোজা রাখে না।
ইহুদী ও শিয়ারা কিভাবে রোজা রাখে?
ইহুদী জাতি ব্যবীলনীয় বন্দিত্ব কালে ৪র্থ, ৫ম, ৬ষ্ঠ, ও ১০ম মাসে রোজা রাখতো যা তাদের স্বাধীন হওয়ার পর ঐচ্ছিক হয়ে যায়। তারা সপ্তম মাসের ১০ম দিনে ও মে মাসের ৯ম দিনে রোজা রাখে। তারা ইশরাকের সময় থেকে পরবর্তী দিন শেষে রাতের তারা উদিত হওয়া পর্যন্ত রোজা রাখে। মে মাসে নবম দিনে তারা এক সন্ধ্যা থেকে পরবর্তী সন্ধ্যা পর্যন্ত রোজা রাখে। শিয়ারা সুবহে সাদিকে সেহরী করে। কিন্ত শিয়ারা সূর্যাস্তের সাথে সাথে না বরং রাতের তারা উদিত হওয়ার পর ইফতার করে। সুন্নত অনুযায়ী মাগরিবের আযান দেয়ার সাথে সাথে অর্থাৎ সূর্যাস্তের সাথে সাথেই ইফতার করা আবশ্যক। কিন্ত শিয়ারা ইহুদীদের পথ অবলবন করে রাতে গভীর হয়ে তারা উদয় হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে।
রোজার নিয়ত কিভাবে করতে হয়?
সিয়াম অর্থাৎ রোজা মুসলিমদের জন্য ফরজ করা হয়েছে। রমজান মাসের ৩০ দিন রোজা রেখে শাওয়াল মাসের এক তারিখ পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর পালন করা হয়। এই মাসেই রয়েছে মহিমান্বিত রজনী লাইলাতুল কদর। রোজার মাসে ইবাদত করলে অন্যান্য মাসের চেয়ে অনেক বেশি সওয়াব পাওয়া যায়। আল্লাহ বলেছেন, “সিয়াম আমার জন্য এবং আমি নিজে এর প্রতিদান দিবো”-(বুখারী)। মহানবী(সঃ) বলেছেন,” সিয়াম হচ্ছে ঢালস্বরুপ”- (বুখারী ও মুসলিম)। আল্লাহ রোজাদারদের জন্য জান্নাতের একটি বিশেষ দরজা রেখেছেন যার নাম, “রাইয়্যান”। কেবলমাত্র রোজাদাররা এই দরজা দিয়ে জান্নাতে ঢুকতে পারবে। রোজা রাখার বিশেষ কোনো নিয়ত বা দোয়া নেই। শুধুমাত্র রোজা রাখবেন মনে এই নিয়ত থাকাই যথেষ্ট। নিয়তের জন্য আলাদা দোয়া পড়াকে বাধ্যতামূলক মনে করা বেদআত।
সর্বোপরি, রমজান মাস মুমিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনার ও সংযমের মাস। এই মাসে শয়তানকে শিকলাবদ্ধ করা হয়। আসমানের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। আল্লাহ আমাদের সকলকে রমজান মাসে সিয়াম সাধনার ও ক্ষমাপ্রাপ্তির হেদায়াত দিক।