শবে কদর কবে?শবে কদরের ফজিলত কেনো এত বেশি?

শবে কদর এর আরবী প্রতিশব্দ হলো লাইলাতুল কদর। লাইলাতুল কদর মানে মহিমান্বিত রজনী। এ রাতে পবিত্র আল কোরআন লাওহে মাহফুজ থেকে প্রথম আসমানে নাজিল হয়। মহান আল্লাহ বলেছেন, “ রমজান এমন একটি মাস যাতে কুরআন নাজিল হয়েছে।” (সূরা বাকারাঃ ১৮৫)। হাদিসে বর্ণিত আছে একদা মহানবী(সঃ) সাহাবীদের লক্ষ্য করে বনী ইসরাঈল গোত্রের বিখ্যাত ‘শামউন এর ব্যাপারে বললেন। এই ব্যাক্তি সাড়ে তিনশত বছর বেচেছিলেন এবং জীবনভর রোজা রাখতেন। তিনি সারারাত আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগীতে নিমগ্ন থাকতেন। এ বর্ণনা শুনে সাহাবিরা বিমর্ষ হয়ে পড়লেন। তারা বললেন, “ হে আল্লাহর রাসুল(সঃ), আমরা আপনার উম্মত। আমরা একান্তই হতভাগ্য। কেননা আমরা এত দীর্ঘসময় বাচঁবো না এবং এত বেশি পরিমাণে ইবাদতও করতে পারবো না।” তখন মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কোরআনের সূরা কদর নাজিল করেন। যাতে উম্মতে মোহাম্মদীদের জন্য এক মহিমান্বিত রজনীর ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এই রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।

শবে কদর কবে?

শবে কদর কবে এ নিয়ে নানান মতভেদ রয়েছে। যদিও ২৬ রমজান দিবাগত রাতে পবিত্র লাইলাতুল কদর হবার সম্ভাবনা বেশি বলে তবুও এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট দলিল নেই। লাইলাতুল কদরের তারিখের ব্যাপারে নবীজী(সঃ) বলেছেন, “ আমাকে লাইলাতুল কদর দেখানো হয়েছে। অতঃপর আমাকে তা ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে। অতএব তোমরা শেষ রাতের বেজোড় রাতসমূহে তা খোজ করবে।(বুখারী, হাদিস নংঃ ৭০৯)। রাসুল (সঃ) বলেছেন, “ যদি কেউ লাইলাতুল কদর খুজতে চায়, তবে সে যেনো তা রমজানের শেষ দশ রাত্রিতে খোঁজ করে।(মুসলিম, হাদিস নং-৮২৩)। অন্য এক হাদিসে নবীজী বলেছেন, “রমজানের শেষ দশদিনে তোমরা কদরের রাত তালাশ করো(মুসলিম, হাদিস নং-১১৬৯)। অর্থাৎ রমজানের শেষ দশদিনের বেজোড় রাতগুলোতে শবে কদর খুজতে হবে। রমজান মাসের শেষ বেজোড় রাতগুলো হলো যথাক্রমে ২১তম, ২৩ তম, ২৫তম, ২৭তম, ও ২৯তম রাত। অর্থাৎ ২০ রমজান, ২২ রমজান, ২৪ রমজান, ২৬ রমজান, এবং ২৮ রমজান দিবাগত রাতগুলোতে শবে কদরের খোঁজ করতে হবে।

শবে কদরের ফজিলতঃ

মহান আল্লাহ উম্মতে মোহাম্মদীকে এমন এক মহিমান্বিত রজনী দিয়েছেন যা হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। এ রাতের ইবাদত হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। কদরের রাতের মহিমা বর্ণনা করে আল্লাহ সূরা কদর নাজিল করেছেন। এ সূরায় আল্লাহ বলেন, “ নিশ্চয়ই আমি তা(কোরআন) অবতীর্ণ করেছি কদরের রাতে। আর কদরের রাত সম্বন্ধে তুমি কি জানো? কদরের রাত হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। সে রাতে ফেরেশতারা ও রুহ অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক কাজে তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে। শান্তিই শান্তি বিরাজ করে ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত।”-(সূরা কদর, আয়াতঃ ১-৫)। এ রাতে আল্লাহর যে বান্দা আল্লাহর সন্তষ্টি ও ক্ষমা পাওয়ার আশায় ইবাদত করবে তার পূর্ববর্তী গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। রাসুলুল্লাহ(সঃ) বলেছেন, “যে কদরের রাতে ঈমান ও সওয়াবের নিয়তে নামাজ পড়ে, তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়।”(সহিহ বুখারী, মুসলিম)।

শবে কদরের নামাজ কত রাকাত

শবে কদরের নামাজ কত রাকাত?

শবে কদরের নামাজ ২ রাকাত করে পড়তে হয়। অর্থাৎ প্রথমে ২ রাকাত পড়ে সালাম ফিরিয়ে আবার একই নিয়মে ২ রাকাত পড়তে হবে। এভাবে যত বার খুশি ২ রাকাত করে নামাজ পড়া যাবে। এ রাতে বেশি বেশি ইস্তেগফার ও দরুদ পড়া উচিত। আয়েশা (রাঃ) বলেন,” হে আল্লাহর রাসুল, যদি আমি লাইলাতুল কদর পাই, তাহলে আমি কি বলবো? তখন রাসুলুল্লাহ(সঃ) বলেন, “ তুমি বলবে, হে আল্লাহ আপনি ক্ষমাশীল, মর্যাদাময়, আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন। আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।(তিরমিযী)। এ রাতে আল্লাহর কাছে বেশি বেশি ক্ষমা চাইতে হবে। শবে কদরের নামাজের আলাদা কোনো নিয়ত বা দোয়া নেই। তবে প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহার সাথে অন্য সূরা পড়ার পর সূরা কদর একবার করে পাঠ করতে পারেন। কিন্ত এ বিষয়ে বাধ্যতামূলক কোনো নিয়ম নেই। এ রাতের নফল ইবাদত হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। তাই রমজান মাসের প্রতি বেজোড় রাতেই শবে কদর খোজার জন্য বেশি বেশি ইবাদত ও ইস্তেগফার পড়তে হবে।

শবে কদরের রাতের কিছু আলামতঃ

আল্লাহ বলেছেন, “শান্তিই শান্তি সে রাতে ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।(সূরা কদর, আয়াতঃ ৫)। লাইলাতুল কদরের রাত শেষ দশ রমজানের বেজোড় রাতগুলোতে সন্ধান করতে বলা হয়েছে। লাইলাতুল কদরের রাতের কিছু আলামত রয়েছে। নবীজী বলেন,  “ লাইলাতুল কদরের আলামত হচ্ছে, সে রাতে চাঁদ উজ্জ্বল হবে, আবহাওয়ায় প্রশান্তি থাকবে। না ঠান্ডা , না গরম। সকাল পর্যন্ত কোনো উল্কাপিণ্ড দেখা যাবে না। সে রাতে চাঁদের মতোই সূর্য উঠবে(তীব্র) আলোকরশ্মি ছাড়া। শয়তান সে সময় বের হয় না। (মুসনাদে আহমাদঃ ২২৭৬৫)। আলেমদের মতে পবিত্র লাইলাতুল কদরের কিছু আলামত/বৈশিষ্ট্য হলোঃ

  • সে রাতে গভীর অন্ধকার থাকবে না।
  • গরম বা শীত কোনোটাই থাকবে না। সে রাত হবে নাতিশীতোষ্ণ।
  • মৃদুমন্দ বাতাস প্রবাহিত হতে থাকবে।
  • সে রাতে ইবাদত করে আল্লাহর বান্দারা তৃপ্তিবোধ করবে।
  • সে রাতে এক আশ্চর্যময় প্রশান্তি অনুভুত হবে।
  • সে রাতে বৃষ্টি বর্ষণ হতে পারে।
  • সকালে হালকা আলোকরশ্মিযুক্ত সূর্যোদয় হবে যা তীব্র হবে না। সে সূর্যোদয় হবে পূর্ণিমার চাঁদের মতো।
শবে কদর নিয়ে ভুল ধারণা

শবে কদর নিয়ে ভুল ধারণাঃ

অনেকের মতে শবে কদর ২৬ রমজান দিবাগত রাতে। তাই বেশিরভাগ মানুষ ২৬ রমজান দিবাগত রাতকে শবে কদর মনে করে শুধুমাত্র সেই রাতেই ইবাদত বন্দেগী করে থাকে। কিন্ত এ ধারণা সঠিক নয়। মহানবী(সঃ) রমজানের শেষ দশদিনের বেজোড় রাতগুলোতে শবে কদর খুজতে বলেছেন। অর্থাৎ এই শেষ দশদিনের যেকোনো বেজোড় রাতেই শবে কদর হতে পারে। তাই আমাদের রমজান মাসের শেষ দশদিনের প্রতিটি বেজোড় রাতকেই শবে কদর মনে করে ইবাদত করতে হবে।

লাইলাতুল কদর আমাদের জন্য আল্লাহর রহমত নিয়ে আসে। এ রাত হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। মহানবী(সঃ) এর উম্মত হিসেবে এ রাত আমাদের জন্য আল্লাহর বিশেষ উপহার। তাই আমাদের উচিত রমজানের শেষ দশদিনের বেজোড় রাতগুলোতে শবে কদর খুজে সে অনুযায়ী আমল করা।