ডিভোর্স কিংবা দাম্পত্য কলহ দুটি ক্ষেত্রেই সবচেয়ে ভোগান্তির শিকার হয় সন্তান। বর্তমান সমাজে দাম্পত্য কলহ আর ডিভোর্স যেনো প্রাত্যাহিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। কিন্ত ডিভোর্স কেনো হয়? দাম্পত্য কলহ কেনো হয়? ডিভোর্স বা দাম্পত্য কলহ সন্তানকে কতটা প্রভাবিত করে? প্রতিদিন বাবা মায়ের ঝগড়া আর মনমালিন্য দেখে যে শিশু বড় হয়, তার মানসিক অবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ধরনের শিশুরা অসহায় আর নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাবা মায়ের দাম্পত্য কলহ সন্তানের ডিপ্রেশনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সন্তান বুঝে উঠতে পারেনা সে আসলে কার পক্ষ নিবে? এমনকি ডিভোর্সের পর সন্তান কার কাছে থাকবে সেটা নিয়েও বাধে বিপত্তি। ছোটবেলা থেকে যেসব শিশু এসব দেখে বড় হয়, কিছুক্ষেত্রে তাদের ব্যাক্তিজীবনে এর মারাত্মক প্রভাব পড়ে। এ ধরনের শিশুরা মারামারিতে জড়ায়, ভয়ে থাকে, কিছু ক্ষেত্রে হিংস্র হয় অথবা আত্মহত্যাপ্রবণ হয়ে ওঠে।
ডিভোর্স কেনো হয়?
বাংলাদেশে গ্রামের চেয়ে শহরে ডিভোর্সের হার তুলনামূলক বেশি। ২০২৩ সালের তথ্যসূত্র অনুযায়ী ঢাকায় প্রতি ৪০ মিনিটে একটি করে ডিভোর্স হয়। এর পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকে। বাংলাদেশে ডিভোর্সের প্রধান কারণসমূহ হলোঃ
- দাম্পত্য কলহ।
- বোঝাপড়ার অভাব।
- তৃতীয় পক্ষ।
- যৌন অক্ষমতা।
- সন্দেহ।
- ভরণপোষনের অক্ষমতা।
- নারীর স্বনির্ভরতা।
- সন্তান ধারণের অক্ষমতা।
- পুত্র সন্তানের প্রত্যাশা।
অনেকেই স্বেচ্ছাচারীতা বা স্বাধীন জীবনযাপনের বাসনায় ডিভোর্সের দিকে ঝুঁকে পড়ে। কিন্ত তাদের নিজেদের ভালো থাকার চেষ্টায় সন্তানের জীবন নষ্ট হয়ে যায়। বাবা মায়ের “মাই লাইফ মাই রুলস” বা স্বাধীন জীবনযাপনের স্বপ্ন সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য অনেকাংশে হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
দাম্পত্য কলহ সন্তানকে কতটা প্রভাবিত করে?
দাম্পত্য কলহ থেকেই এক পর্যায়ে ডিভোর্স এবং ক্ষেত্রে বিশেষে খুন কিংবা আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। বাবা মায়ের দাম্পত্য কলহ শিশুমনে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। শিশুরা চুপচাপ হয়ে যায় এবং আতংকিত থাকে। কিছু বাচ্চা মানসিক রোগে ভোগে। সন্তানের সামনে বাবা মা সম্পর্ক ঠিক আছে এমন অভিনয় করলেও তারা সেটা ধরতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে শিশুকে বানানো হয় অভিযোগ দেয়ার মাধ্যম। কেউ কেউ আবার সন্তানের কাছে মাকে কিংবা বাবাকে দোষারোপ করে অভিযোগ করে। সেক্ষেত্রে সন্তানের কাছে একপক্ষ ভালো আর অন্য পক্ষ ভিলেইন হয়ে যায়। সন্তান কার পক্ষ নিবে সেটা বুঝে উঠতে পারে না। বাবা মায়ের নিরব ঝগড়াও সন্তান বুঝে ফেলে। তাই সন্তানকে যেভাবেই হোক দাম্পত্য কলহের চাপ থেকে দূরে রাখতে হবে।
দাম্পত্য কলহ থেকে সন্তানকে দূরে রাখতে করণীয়ঃ
- একপক্ষ কখনোই সন্তানের কাছে অন্যপক্ষের ব্যাপারে অভিযোগ করবেন না।
- সন্তানের সামনে হাসিখুশি ব্যবহার করুন।
- সন্তানের সামনে ঝগড়া, ভাঙচুর, মারামারি, কিংবা চিৎকার করবেন না।
- আপনাদের মনমালিন্য হলে তৃতীয় পক্ষকে বলবেন না। নিজেরা মিটিয়ে ফেলুন।
- সন্তানকে সময় দিন।
- সন্তানের কাছে অপরপক্ষকে ভিলেইন বা খারাপ প্রমাণ করার চেষ্টা করবেন না।
- নিজেরা কথা বলে কলহের সমাধান না হলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হবেন।
- ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নিলে তাৎক্ষণিকভাবে সন্তানকে জানাবেন না।
- ডিভোর্স হলে সন্তানের সামনে নিজেদের ভালো বন্ধু হিসেবে উপস্থাপন করুন।
- সন্তানকে বোঝান যে সে বাবা মা দুজনকেই সমানভাবে ভালোবাসতে পারে।
- ছোটখাট ব্যাপারে ঝগড়া করবেন না। মনমালিন্য হলে সেটা সন্তানের সামনে না বলে মেসেজে কথা বলে সমাধান করুন।
- ডিভোর্সের পর সন্তান কার কাছে ভালো থাকবে সেটা দুজনে মিলে সিদ্ধান্ত নিন। সন্তানের ইচ্ছাকেও প্রাধান্য দাঁড়ায়। আদালতে টানাহেচঁড়া করে সন্তানের শৈশব বিষিয়ে তুলবেন না।
দাম্পত্য সম্পর্ক ভালো রাখার উপায়ঃ
- একে অপরের মতামতকে সম্মান করুন।
- নিজেদের কলহ বা ঝগড়ার বিষয়ে কাউকে জানাবেন না।
- একে অপরকে সময় দেয়ার চেষ্টা করুন।
- নিজেদের কোয়ালিটি টাইম কাটানোর সময় মোবাইল দূরে রাখুন।
- গোপনীয়তা না রেখে সঙ্গীকে সবকিছু শেয়ার করুন।
- কখনোই সঙ্গীকে মিথ্যা বলবেন না।
- কখনোই তৃতীয় পক্ষকে ঝগড়া মেটানোর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করবেন না।
- মনমালিন্য হলে নিজেরা আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টা করুন।
- পুরোনো বিষয় বা ঝগড়া মনে পুষে রাখবেন না।
- একে অপরকে খোঁটা দিবেন না।
- অপরপক্ষের পরিবারকে সম্মান করুন।
- সঙ্গীর খারাপ অভ্যাস বা দোষগুলো নিয়ে কারো সাথে আলোচনা করবেন না।
- নিজেদের একান্ত ব্যাক্তিগত মুহূর্ত বা কথা কখনোই অন্য কাউকে বলবেন না।
- কিছু ক্ষেত্রে ছাড় দেয়ার মনমানসিকতা রাখুন।
- সন্দেহ প্রবণতা থেকে দূরে থাকুন। গোয়েন্দাগিরি না করে সরাসরি কথা বলুন বা প্রশ্ন করুন।
ডিভোর্স কিংবা দাম্পত্য কলহ কখনোই কেউ কামনা করেনা। কিন্ত তবুও দিনশেষে মতের অমিল হলে কিছুটা বোঝাপড়া নিজেরাই করে নেয়া উচিত। সন্তানের ভালোর জন্য দাম্পত্য কলহের গ্রাস থেকে সন্তানকে দূরে রাখুন।