হাতের খুচরো পয়সার মতো কিংবা পাঁচশো টাকার একটা নোটের লোভে আমাদের সময়গুলো চুরি হয়ে গেছে। সকলেই মনের মতো একজন বন্ধু খুঁজতে গিয়ে ভুল মানুষের ভীড়ে হাবুডুবু খাচ্ছি। আমাদের সময় চুরি হয়ে গেছে মোবাইলের স্ক্রিনে, এক মিনিটের রিলে। আমরা নিঃস্ব হয়েছি অজান্তেই। পোড়াতেলের ভাজাপোড়া খেয়ে আমরা অল্পতে হাঁপিয়ে যাওয়া শিখেছি। আমাদের দম, সাহস সব আস্তে ধীরে মিইয়ে যাচ্ছে । এতসব যান্ত্রিকতা, বিষণ্ণতা, হতাশার দিনে জীবনে আলো নিয়ে যারা পাশে এসে দাঁড়ায় তারাই তো বন্ধু। ব্যস্তজীবনে বন্ধুরা যেন স্বস্তির বাতাস। মনখোলা আড্ডা দেওয়া বিকেল কিংবা ছাদে রাত জাগা মেন্টাল রিলিফের আশ্রয়। আমরা প্রত্যেকেই কারো কাছে কিছু না কিছু রেখে আসি। কেউ আমাদের কাছে রেখে যায় বৃষ্টিভেজা বিকেল। কেউ চিনিয়ে যায় জীবনানন্দকে। নীল মনে করায় নীরাকে। হুমায়ূন আহমেদ আমাদের কাছে রেখে গিয়েছে হিমু আর মিসির আলীকে। বন্ধুরা আমদের জীবনে রেখে যায় সুন্দর স্মৃতি, শিক্ষা, মূল্যবোধ। বন্ধুরা চিনিয়ে দেয় জীবনের অসংখ্য গলি, বাঁক, চোরাপথ।
বন্ধুত্ব বয়স বাড়ার সাথে সাথে সত্যি কী হারিয়ে যায়?
শায়ানের জনপ্রিয় একটি গান আছে “ কেন বাড়লে বয়স ছোট্ট বেলার বন্ধু হারিয়ে যায়”। এছাড়া এই টপিকে কথা উঠলেই মনে পড়ে যায় “ কিছু কিছু নাম্বার থেকে,আর আসবেনা কোন ফোন”-গানের লিরিক্স।
একটা সময় আসে যখন ভীড়ের মাঝে দাঁড়িয়েও একলা হয়ে যাওয়া শিখতে হয়। একটা সময় মেসেঞ্জারে সবাই থাকে অথচ কেউ আপনার হয়ে হয়তো থাকে না। হাজার হাজার লোক লিস্টে থাকলেও কেমন একলা একলা লাগে! সব যোগাযোগ মুছে যায় আস্তে আস্তে। পুরাতন সব বন্ধুরা শহর ছাড়ে। নতুন যারা বন্ধু হয়, তারা শুধু “পরিচিত”। ওদের হাত ধরা যায় না, কাঁধে মাথা রাখা যায় না। গানের প্লেলিস্ট মিলে না। এক পাতে মাখা ভাত খাওয়া যায় না, আরো অনেক কিছু। বয়স বাড়ার সাথে সাথে অনেক বন্ধুই হারিয়ে যায়, এ যেমন সত্য তেমনি অনেকেই রয়ে যায় জীবনে। চলার পথে সময়ের পরিক্রমায় হয়তো কেউ হারিয়ে যায়। আবার নতুন কেউ যুক্ত হয় জীবনে।
অনলাইন নাকি অফলাইনের বন্ধু কাকে বেশি গুরুত্ব দিবেন?
বর্তমানের তরুন প্রজন্ম মোবাইল ছাড়া একটা দিনও যেন কাটাতে পারে না। প্রযুক্তির প্রসারে সোশ্যাল মিডিয়ায় সবারই সরব উপস্থিতি। স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে চাকুরিজীবী, কৃষক, গৃহিণী, দিনমজুর সবার হাতে হাতেই এখন মুঠোফোন। বাস্তব জীবনের পরিচিতি ছাড়িয়ে এখন জনপ্রিয় অনলাইনের বন্ধুরা। মুখোমুখি দেখা না হলেও গড়ে উঠছে বন্ধুত্ব। চিন্তা ভাবনা, মানসিকতার মিল থাকলেই বন্ধু হওয়া সহজতর হচ্ছে। এরফলে কিছু মানুষ বাস্তবের চেয়েও ভার্চুয়াল লাইফের বন্ধুদের সাথে বেশি সময় কাটাচ্ছেন। অনলাইন হোক কিংবা অফলাইন হোক ভালো মনের বন্ধুকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত।
মানুষ ভালো হলে অনলাইন কিংবা অফলাইন ম্যাটার করে না। এমন কিছু মানুষ থাকে যাঁরা দুঃসময়ে পাশে থাকে। তাঁরা আপনার অগোছালো জীবনটাকে একটা লাইন আপে নিয়ে আসে। গুছিয়ে দেয়, ভরসা দেয় বৃষ্টিদিনের ছাতার মতো। এই বন্ধুগুলো এত ভালো হয়! এঁদের কোনো চাহিদা থাকে না, চাওয়া পাওয়া নেই, আবদার করে না অথচ অধিকার খাটায় সূক্ষ্ণভাবে। রাত জেগে সময় দেয়। আপনার প্রতিটা কথা মনোযোগ দিয়ে শুনে। এঁরা হয়তো খুব একটা হাসাতে পারে না। দামী রেস্টুরেন্টে ট্রিট দিতে পারে না। কোনো ট্রিপ স্পন্সর করে না। জন্মদিনে গিফট দেয় না, তিনমাসে একবার দাওয়াতও করে না। তবে এঁরা আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দেয়। নতুন একটা শুরুর জন্য ব্রেক দেয় এবং বিশ্বাস রাখে আপনার উপর। “তুই পারবি, যাস্ট লেগে থাক”, এই কথাটা শুধু মুখে বলেই দায়িত্ব শেষ করে না। নিয়মমাফিক খোঁজ রাখে। আপনি স্ট্যাবল না হওয়া অবধি এঁদের সঙ্গ পাবেন।
বর্তমান যুগের পরিস্থিতি বিবেচনায় অনলাইন ও অফলাইন দুই ধরনের বন্ধুকেই প্রাধান্য দেওয়া উচিত। এতে শেয়ারিং ও কেয়ারিং দুটোই বাড়ে। তাই যে কারো উচিত অনলাইন এবং অফলাইন বন্ধুদের মাঝে সামঞ্জস্য বজায় রাখা। সব বন্ধুকেই সমান প্রায়োরিটি দিতে হবে। ভালো বন্ধুকে সময় না দেওয়ার অজুহাতে হারানো যাবে না।
বন্ধুত্বের চিরচেনা রূপ কি পাল্টে যায় সময়ের আবর্তে?
প্রতিটি সম্পর্কেই চড়াই-উৎরাই থাকে। সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তন সবার জীবনেই আসে।বন্ধুরা আমাদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। একসাথে সময় কাটানো বন্ধুদের কলেজ চেঞ্জ হয়। একেক জন একেক ভার্সিটিতে ভর্তি হয়। চাকুরি হয় ভিন্ন ভিন্ন শহরে। চেনা বন্ধুরা শহর ছাড়ে। প্রয়োজনের পরিবর্তনকে পাশ কাটানো যায় না। ভালো বন্ধুরা কখনো ছেড়ে যায় না। দূরত্ব, তাঁদের বন্ধুত্বকে ম্লান করতে পারে না। তাই কিছু মানুষ আপনার জীবনে থেকে যায় আমৃত্যু। সব সম্পর্ক ছাপিয়ে যায় বন্ধুত্বের বন্ধন।