পহেলা ফাল্গুন উৎসব কবে প্রথম শুরু হয়েছিল?

“ফুল ফুটুক আর না ফুটুক আজ বসন্ত”- এই শব্দগুলো কেউ শুনেনি এমন লোক খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তরুণদের কাছে হাল আমলের “ বসন্ত এসে গেছে” গানটিও খুব জনপ্রিয়। শহুর থেকে গ্রাম সবখানেই পহেলা ফাল্গুন পালিত হয় সাড়ম্বরে। তরুন-তরুণীরা বাসন্তী রঙে নিজেদের রাঙিয়ে তোলে। হলুদ শাড়ি আর পাঞ্জাবি পরে  দিনভর আড্ডা, গান, কবিতায় মুখর করে রাখে চারপাশ। মেতে উঠে বাঙালিয়ানায়। পুরো শহরটাকে মনে হয় এক হলুদ বাগান! তবে অনেকেই জানেন না কেন এই পহেলা ফাল্গুন উৎসব পালন করা হয়? কে প্রথম শুরু করেছিল এই প্রাণের উৎসব? উৎসবটি কতদিন ধরে চলে আসছে বাংলায়? এইসব প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেন না অধিকাংশ তরুণ তরুণীরাই। ফাল্গুনের উৎসবকে জাতীয় ঐতিহ্যের বাহক বলে গণ্য করলে “পহেলা ফাল্গুন” নিয়ে প্রাথমিক ধারণা থাকা উচিত।

পহেলা ফাল্গুন” কী

“পহেলা ফাল্গুন” কী? 

ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। যদিও জলবায়ুগত কারনে  শরৎ ও হেমন্ত আজকাল খুবই ক্ষণস্থায়ী। বাংলা মাসের চৈত্র ও ফাল্গুন মাস নিয়ে বসন্ত। বসন্তকে বলা হয় ঋতুরাজ। বাংলা পঞ্জিকামতে, ফাল্গুন মাসের প্রথম দিনটিই পহেলা ফাল্গুন। বসন্তে প্রকৃতি সাজে নবরূপে। গাছে গাছে নতুন সবুজ পাতা, ডালে ডালে পলাশ, গাঁদা ফুল, কোকিলের কলতান। বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের পরিচায়ক এই “পহেলা ফাল্গুন”। বসন্তকাল আমাদের জাতীয় কিংবা রাজনৈতিক উভয়ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ। ফাল্গুন ভাষার মাস হিসেবেও পরিচিত।

পহেলা ফাল্গুন উৎসব কবে শুরু হয়েছিল?

কার হাত ধরে আসলে এই উৎসব হয়ে উঠল কোটি বাঙালির প্রাণের উৎসব? তা নিয়ে কিছুটা মতভেদ আছে। প্রাচীনকাল থেকেই বাংলায় বসন্ত উৎসব পালিত হয়ে আসছে। খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ অব্দে মেসোপটেমিয়া যুগের মধ্যে ব্যাবিলনীয় সভ্যতায় বর্ষবরণ উৎসব পালন শুরু হয়। তখন বেশ জাঁকজমকের সাথে পালন করা হতো বর্ষবরণ উৎসব। তবে সে উৎসব ১ জানুয়ারি পালন করা হতো না। তখন বর্ষবরণ উৎসব পালন করা হতো বসন্তের প্রথম দিনে।

ব্যাবিলনীয় সভ্যতার পর নববর্ষ পালন শুরু করে রোমানরা। রোমানরাও ব্যাবিলনীয় সভ্যতার মতো বর্ষবরণ উৎসব পালন করতো বসন্তের প্রথম দিনে। এরপর খ্রিস্টপূর্ব ৭৩৮ অব্দে রোমান সম্রাট রোমুলাসই নির্ধারিত ক্যালেন্ডারের প্রথম দিন করা হয়েছিল তাদের ঐতিহ্য মতে বসন্তের প্রথম দিন । পরবর্তীতে আরেক রোমান সম্রাট নুমা পন্টিলাস বিশেষ করে ইতিহাসখ্যাত রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজারের আদেশে বর্ষশুরু এবং নববর্ষ উৎসব ১ মার্চ থেকে চলে আসে ১ জানুয়ারি ।

বাংলাদেশে পহেলা ফাল্গুন

বাংলাদেশে পহেলা ফাল্গুনঃ 

বঙ্গাব্দ ১৪০১ সাল থেকে বাংলাদেশে প্রথম ‘বসন্ত উৎসব’ উদ্‌যাপন করার নিয়ম চালু হয়। এরপর থেকে “পহেলা ফাল্গুন” দেশজুড়ে পালিত হয় উৎসাহ ও উদ্দীপনার সাথে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে শুরু করে, রবীন্দ্র সরোবর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার বকুলতলায়, বাহাদুর শাহ পার্ক, শাহবাগ। শহরের মুক্তমঞ্চে  প্রতিবছর জাতীয় বসন্ত উৎসব আয়োজন করা হয়। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯২৫ সালে শান্তিনিকেতনে প্রথম বসন্ত উৎসব শুরু করেছিলেন। পহেলা ফাল্গুন সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সময়কালে । পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনে নৃত্যগীতের মাধ্যমে বসন্ত উৎসব পালনের ধারা চলে আসে এ বাংলায়।  শুধু বাংলাদেশ কিংবা ভারতের পশ্চিমবঙ্গ নয়,  বসন্তের প্রথম দিন ব্যাপক আয়োজনে বর্ষবরণ উৎসব পালন করে চীন।

পহেলা ফাল্গুন কিভাবে বাঙালির প্রাণের উৎসবে পরিণত হলো?

সাহিত্যের পাতায় কিংবা আমদের জাতীয় জীবনে বসন্ত এসেছে  নানাভাবে। বসন্তেই ভাষা আন্দোলন হয়েছিল । বসন্তেই বাঙালি মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেছিল। বসন্তেই বাঙালি গণঅভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে তাঁদের বীরত্ব প্রদর্শন করেছিল।  ১৮ বছর আগে বঙ্গাব্দ ১৪০১ সাল থেকে প্রথম ‘বসন্ত উৎসব’ উদযাপন করার রীতি চালু হয় এ বাংলায়। বসন্তের সাথে বাঙালির বীরত্ব, সাহস, সংগ্রাম, বর্ণিল জীবন সবই ওতপ্রোতভাবে জড়িত।  

বসন্ত নিয়ে রচিত হয়েছে গান ও কবিতা। সবচেয়ে বেশি লেখালখি হয়েছে বোধহয় এ ঋতু নিয়েই। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “ আহা, আজি এ বসন্তে এত ফুল ফুটে, এত বাঁশি বাজে, এত পাখি গায়।” এছাড়া বসন্তকে প্রাধান্য দিয়ে লিখেছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, ফররুখ আহমেদ,  হেলাল হাফিজ, জহির রায়হান, বেগম সুফিয়া কামাল। এমনকি ইংরেজি সাহিত্যের বিখ্যাত কবি শেলীর লেখাতেও বসন্ত উঠে এসেছে। এভাবেই বসন্তের নতুন রূপ, বাঙালি মনে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে।

ফাল্গুনে সবাই হলুদ পরে কেন

ফাল্গুনে সবাই হলুদ পরে কেন? 

পহেলা ফাল্গুনে কেন হলুদ রঙকেই প্রাধান্য দেওয়া হয় ? এ প্রশ্নটি অনেকের মনেই ঘুরপাক খায়।  হলুদ আসলে মৌলিক কোনো রঙ নয়। হলুদ রঙকে ধরা হয় কমলা আর সবুজ রঙের মাঝামাঝি রঙ। ফাল্গুন মাসে গাছে গাছে নতুন পাতা, বাগানে ফুলের সমারোহ। বসন্তে প্রকৃতির মাঝে যে পরিবর্তন আসে তা মূলত রঙে ও রূপে। এবংকি মানুষের মনেও!  সবুজ পাতার ভিড়ে থাকে হলুদ, কমলা, লাল, সাদা এবং গোলাপি ফুলের ছড়াছড়ি। তবে এর মধ্যে হলুদ, লালচে কমলা, হলদে-সাদা এবং লাল রঙের ফুল বেশি দেখা যায়। এ কারণেই বসন্ত কিংবা ফাল্গুনে অন্য রঙের তুলনায় হলুদ রঙটি বেশি গুরুত্ব পায়। এছাড়া হলুদ রং হলো ভালোবাসার প্রতীক। হলুদ রং দিয়ে বসন্ত, আনন্দ, উঞ্চতা, ঈর্ষা বোঝানো হয়। 

ফাল্গুনে সোনালু, জুঁই, বকুল, মাধবীলতা, পলাশ, কাঠচাঁপা, মুচুকুন্দ, কনকচাঁপা, শিমুল, ইত্যাদি ফুল দেখা যায়। আর এ ফুলগুলোতে  রয়েছে হলুদ রঙের ছোঁয়া। তাই ফাল্গুনে প্রকৃতি সাজে হলদে রঙে। তরুণ তরুণীরাও নিজেদেরকে সাজায় হলুদ কিংবা বাসন্তী রঙে। তবে এ সাজ যে শুধুমাত্র হলুদ রঙের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে, তা কিন্তু নয়। বরং হলুদের পাশাপাশি কমলা, সবুজ, হলদে সাদা, লাল কিংবা মেরুন রঙের দেখাও মিলে সাজে এবং পোশাকে।