শবে বরাতের মাহাত্ম্য এবং ফজিলত নিয়ে আমরা প্রায়শই দ্বিধান্বিত হয়ে থাকি। কি কি কাজ শবে বরাতে করা উচিত এবং করা উচিত না সেটা নিয়েও রয়েছে নানান মত। শবে বরাত কি আসলেই ইসলাম স্বীকৃত? শবে বরাতের নামাজ পড়ার নিয়ম কি? শবে বরাতে কত রাকাত নামাজ পড়তে হয়? শবে বরাতে রোজা রাখা জরুরি কি? শবে বরাত উপলক্ষে একসাথে কয়টা রোজা রাখা যাবে? নিশ্চয়ই এমন নানা প্রশ্ন ঘুরছে মাথায়? শবে বরাতে বিশেষ খাবার রান্না, রুটি হালুয়া বানানো কি ইসলামসম্মত? শবে বরাতের ফজিলত সম্পর্কে ইসলাম কি বলে? শবে বরাত নিয়ে এমন নানান দ্বিধাদ্বন্দ চলে আসছে। কেউ কেউ প্রাচীন নিয়ম বা কুসংস্কারকে বিশ্বাস করে বেদ’আত করে ফেলছেন। শবে বরাতে কোন কাজগুলো শরীয়ত অনুমোদিত আর কোন কাজগুলো বেদ’আত জানতে চান নিশ্চয়ই। আজ জানবো শবে বরাত নিয়ে ইসলাম কি বলে? শবে বরাতে কি কি করনীয় এবং কি কি বর্জনীয় এসব বিষয়ে বিস্তারিত।
শবে বরাত কি?
শবে বরাত বা লাইলাতুল বরাত বলতে ইসলামে কোনো দিবস সম্পর্কে বর্ণিত নেই। শবে বরাত মুলত ফারসি শব্দ যার বাংলা অর্থ হচ্ছে মুক্তির রজনী। ইসলামী পরিভাষায় একে মধ্য শাবানের রাত বলার হয়ে থাকে। শাবান মাসের ১৪ ও ১৫ তারিখের মধ্যবর্তী যে রজনী, তাকেই মধ্য শাবানের রাত বলা হয়। প্রায় ১০ জন সাহাবী হতে বর্ণিত ও রাসুল(সাঃ) এর হাদিস অনুযায়ী এই রাতের তাৎপর্য রয়েছে। মহানবী হযরত মুহম্মদ(সঃ) বলেন,” মধ্য শাবানের রাতে আল্লাহ আত্মপ্রকাশ করেন এবং মুশরিক ও হিংসুক ব্যাতীত সবাইকে ক্ষমা করেন -( ইবনু মাজাহ, আস- সুনান ১/৪৪৫; আহমদ ইবনু হাম্বল, তাবরানী, বায়হাক্বী, আল-মুসনাদ ২/১৭৬; কিতাবুত তাওহীদ ১/৩২৫-৩২৬।)
শবে বরাতের নামাজ পড়ার নিয়ম কি?
শবে বরাতের রাতে আল্লাহ মুশরিক এবং হিংসুক ব্যাতীত সবাইকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন যারা তার নিকট ক্ষমা চেয়ে থাকেন। তাই এই রাতের তাৎপর্য রয়েছে। তবে শবে বরাতের নামাজ শবে বরাত উপলক্ষে পড়তেই হবে এমন নিয়ম ভেবে নিলে সেটা বেদ’আত হবে। আপনি চাইলে এ রাতে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা ও নফল ইবাদত করতে পারেন। তবে এ রাতে নামাজের আলাদা কোনো নিয়ম নেই। এ রাতে আপনি বেশি বেশি ইস্তেগফার এবং দরুদ পড়তে পারেন। এছাড়াও সাধারণ নফল নামাজের নিয়মে নফল নামাজ পড়তে পারেন। তবে এতে কোনো বাধ্যবাধকতা বা নিয়ম নেই।
শবে বরাতে কি রোজা রাখা যাবে?
মধ্য শাবানের রাতে সেহরী করে রোজা রাখা যাবে। তবে একে নিয়ম মনে করলে তা বেদ’আত বলে গণ্য করা হবে। সহীহ হাদিস দ্বারা জানা যায়, শাবান মাসে রাসুল(সাঃ) সবচেয়ে বেশি নফল রোজা রাখতেন। এ বিষয়ে মহানবী(সঃ) বলেছেন, “ এ মাসে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে মানুষের আমল/কর্ম উঠানো হয়। আর আমি ভালোবাসি যে রোজা অবস্থায় আমার আমল উঠানো হোক। -(নাসাঈ, আস-সুনান ৪/২০১; আলবানী, সহীহুত তারগীব ১/২৪৭।)
আলী ইবনে আবী তালেব(রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে রাসুল(সাঃ) বলেছেন, “ যখন মধ্য শাবানের রাত আসে তখন তোমরা রাত জেগে সালাত আদায় করবে এবং দিনে সিয়াম পালন করবে। কেননা আল্লাহ তা’আলা এ রাতে সূর্যাস্তের পর দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন। এবং বলেন, “ আছে কি কোনো ক্ষমা প্রার্থনাকারী? তাকে আমি ক্ষমা করবো। আছে কি কোনো রিযিক প্রার্থনাকারী? আমি তাকে রিযিক দান করবো। আছে কি কোনো বিপদগ্রস্ত ব্যাক্তি? আমি তাকে সুস্থতা দান করবো। এভাবে ফজর পর্যন্ত বলা হয়ে থাকে।- (ইবনে মাজাহ, বায়হাকি)
শবে বরাত উপলক্ষে বিশেষ খাবার রান্না করা কি জায়েজ আছে?
শবে বরাত উপলক্ষে বিশেষ খাবার রান্না করতে হবে এমন নিয়ম মানা বেদ’আত। এদিন বারো ইমাম শিয়া মতবাদের দ্বাদশ ইমাম মাহদির জন্মদিন পালন করে থাকে। ইরাক ও ইরানে এই দিনে প্রতিবেশির বাড়িতে গেলে মিষ্টি খাওয়ানো হয়। এছাড়াও ভারতীয় উপমহাদেশে অনেকেই এসিন শবে বরাত উপলক্ষে বিশেষ খাবার আয়োজন করা হয়ে থাকে। এসব খাবারের মধ্যে চালের রুটি, মুরগির মাংস, সুজি, হালুয়া, পায়েশ, ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। তবে এদিন এমন কোনো আয়োজনের নিয়ম ইসলামে নেই। তাই এদিন শবে বরাতের বিশেষ খাবার রান্নাকে নিয়ম মনে করাও বেদ’আত।
শবে বরাত উপলক্ষে প্রচলিত কুসংস্কার কোনগুলো?
শবে বরাত উপলক্ষে বিভিন্ন ভ্রান্ত মতবাদ ও যুক্তি প্রচলিত আছে যা কুরআন এবং হাদিস দ্বারা স্বীকৃত নয়। চলুন জেনে নেই প্রচলিত সেই কুসংস্কারগুলো কি কিঃ
- শবে বরাতকে লাইলাতুল কদরের সমতুল্য ভেবে লাইলাতুল বরাত বলা।
- এদিনে বিভিন্ন খাবারের আয়োজন করে প্রতিবেশীদের মধ্যে বিতরণ।
- এদিনে রোজা রাখাকে সুন্নাহ ভাবা।
- শবে বরাতের উপলক্ষে আলাদা দোয়া আছে বলে মনে করা।
- দলে দলে কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে যাওয়া।
- রুটি এবং হালুয়া বানানো বাধ্যতামূলক ভাবা ও পালন করা।
- শবে বরাতে মৃত ব্যাক্তির আত্মা বাড়িতে এসে ঘোরাফেরা করে এমন ভাবা।
শাবান মাসের ফজিলত ও তাৎপর্য রয়েছে। এই মাসে মহানবী(সঃ) সবচেয়ে বেশি রোজা রাখতেন। মধ্য শাবানের রাতে নফল ইবাদত করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলে আল্লাহ ক্ষমা করে দিতে পারেন। তাই আমাদের উচিত শবে বরাতের ভ্রান্ত ধারণাগুলোকে দূরে রেখে শাবান মাসে বেশি বেশি ইবাদত করা।