রোদে পুড়ে ত্বক কালচে হয়ে গেছে? কিছুতেই যাচ্ছে না সানবার্ন? ট্যান হয়ে রুক্ষ হয়ে গেছে? সহজ উপায়ে ঘরে বসেই দূর করুন ট্যানিং আর রোদে পোড়া কালচে ভাব। জানুন সানবার্ন আর ট্যানিং থেকে মুক্তির ঘরোয়া টিপস ও প্রয়োজনীয় প্রোডাক্ট সম্পর্কে বিস্তারিত-
ট্যানিং এবং সানবার্ণ কি?
তীব্র গরমে কিংবা বাইরের প্রখর রোদে দীর্ঘসময় থাকলে ত্বক হয়ে যেতে পারে কালচে, রুক্ষ ও অতিরিক্ত ঘাম বন্ধ করে দিতে পারে লোমকূপের ছিদ্র। মুখ কিংবা মাথার স্ক্যাল্পের লোমকূপের ছিদ্র আটকে গেলে ব্যাকটেরিয়া কিংবা ছত্রাকের সংক্রমণে সৃষ্টি হতে পারে ব্রণ, খুশকি ও নানা জটিল চর্মরোগ। রোদের দহনে কালচে পোড়া লালভাবকে সানবার্ন বলে এবং ত্বকে কালো তামাটে স্তর পড়লে সেটাকে ট্যানিং বলে।
সানব্লক আর সানস্ক্রিনের পার্থক্য জানেন তো?
ভাবছেন সানব্লক আর সানস্ক্রিন একই জিনিস? মোটেও না। অবাক লাগছে? হ্যা সূর্যের ক্ষতিকারক UV রশ্মি থেকে দুটোই সুরক্ষা দেয় তবে এই দুটো একই জিনিস নয় এবং তাদের কাজও এক নয়। চলুন তাহলে জেনে নেয়া যাক সানস্ক্রিন আর সানব্লকের মধ্যে পার্থক্যটা আসলে কি!
সানস্ক্রিন পণ্য এক ধরনের সুরক্ষাকারী প্রলেপ তৈরী করে যার কারনে সূর্যরশ্মি একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ত্বকের ভেতরে ঢুকতে পারে না। অন্যদিকে সানব্লক ত্বকের দিকে ধেয়ে আসা সূর্যরশ্মিকে প্রতিফলিত করে ফিরিয়ে দেয়। তাই সানস্ক্রিনের চাইতেও সানব্লককেই অধিক শক্তিশালী ও কার্যকরী বলা হয়ে থাকে।
বলুন তো সানস্ক্রিন আর সানব্লকের গায়ে SPF কেনো লেখা থাকে? SPF মানেই বা কি?
SPF পূর্ণরূপ হচ্ছে সান অ্যাক্টিভ ফ্যাক্টর। প্রতিটি সানস্ক্রিন এবং সানব্লকের গায়ে বড় হাতের ইংরেজি অক্ষরে SPF লেখা থাকে। সাধারণত বাজারে SPF-15, SPF-30, SPF-45, SPF-50, SPF-60 সম্বলিত প্রোডাক্ট পাওয়া যায় যা সূর্যরশ্মি থেকে কতগুন এবং কতক্ষন প্রোটেকশন দিবে তা তাদের গায়ে লেখা SPF থেকে বোঝা যায়। ভাবছেন কি করে বুঝবেন? চলুন জেনে নেয়া যাক। ধরুন কোনো প্রোডাক্টের গায়ে SPF-15 লেখা আছে, এর মানে হলো এই পণ্যটি আপনার ত্বকের সহ্যক্ষমতার তুলনায় ১৫ গুন বেশি সুরক্ষা দেবে সূর্যরশ্মি থেকে। সাধারণত সূর্য থেকে ক্ষতিকারক UV রশ্মি তিন ধরনের হয়ে থাকে- UV-A, UV-B এবং UV-C রশ্মি। এই রশ্মিগুলো ত্বকের কোলাজেন উৎপাদন কমিয়ে দেয়, পিগমেন্টেশনের মাধ্যমে কালচে ভাব তৈরী করে, সানবার্ন এবং ট্যানিং সৃষ্টি করে ত্বককে মলিন ও নির্জীব করে দেয়। কোনটি কতক্ষন সূর্যের ক্ষতিকারক রশ্মি থেকে সুরক্ষা দেবে তা সেই পণ্যের গায়ে লেখা SPF সংখ্যার সাথে ১০ গুন করলে যত সংখ্যা হবে তত মিনিট। যেমন কোনো পণ্যের গায়ে SPF-30 লেখা থাকলে সেটি ৩০০ মিনিট পর্যন্ত সূর্যের ক্ষতিকারক রশ্মি থেকে সুরক্ষা প্রদান করে। যদিও প্রতি দুই ঘন্টা পরপর পর পুণরায় প্রয়োগ করাই উচিত।
সানস্ক্রিন ও সানব্লক কত ধরনের হয়ে থাকে?
উপাদানের ওপর ভিত্তি করে এগুলো দুই ধরনের- রাসায়নিক প্রকৃতির ও খনিজ প্রকৃতির। চলুন জেনে নেই তাদের সম্পর্কে-
রাসায়নিক প্রকৃতির সানস্ক্রিন ও সানব্লক: এগুলো বাজারজাতকৃত পণ্য হিসেবে কিনতে পাওয়া যায়। এই পণ্যগুলোতে আভোজেন, অক্টিসালেট, অক্টোক্রাইলিন, হোমোসালেট ও অন্যান্য সূর্যরশ্মি প্রতিরোধক ত্বকের উপযোগী রাসায়নিক উপাদান পাওয়া যায়।
খনিজ প্রকৃতির সানস্ক্রিন ও সানব্লক: এগুলো বাজারজাতকৃত পণ্য হিসেবে অথবা শুষ্ক গুড়ো হিসেবে পাওয়া যায়। পণ্যগুলো সব শ্রেনীর ও বয়সের মানুষ ব্যাবহার করলেও গুড়ো সাধারণত খেলোয়াড়রা বিশেষ করে ক্রিকেটাররা ব্যাবহার করে থাকে।
সানস্ক্রিন ও সানব্লক পণ্যগুলো কোন কোন ধরনে পাওয়া যায়?
সাধারণত মুখ, গলা, ঘাড়, পিঠ , হাত, পা ও বাইরের রোদে দৃশ্যমান শরীরের অংশের জন্য এই পণ্যগুলো হলো- ক্রিম, জেল, লোশন, স্প্রে, পাউডার, অয়েন্টমেন্ট। চোখের নিচের অংশে ব্যাবহারের জন্য পণ্য হল ওয়াকস্টিক এবং ঠোটের সুরক্ষায় পণ্য হলো SPF যুক্ত লিপবাম।
শিশুদের ক্ষেত্রে সানস্ক্রিন ও সানব্লক পণ্য ব্যাবহার করা যাবে কি?
জ্বি, অবশ্যই যাবে। ৬ মাস বয়সের কিংবা ৬ মাসের বেশি বয়সের বাচ্চার ত্বকে SPF-15 সম্বলিত সানস্ক্রিন কিংবা সানব্লক পণ্য ব্যাবহার করা যেতে পারে।
কত SPF যুক্ত সানস্ক্রিন ও সানব্লক পণ্য ব্যাবহার করা উচিত?
প্রাপ্তবয়স্ক ব্যাক্তিদের ক্ষেত্রে কমপক্ষে SPF-30 সম্বলিত সানস্ক্রিন কিংবা সানব্লক পণ্য ব্যাবহার করা উচিত । তবে বিশ্ব উষ্ণায়নের এই যুগে এসে SPF-50 সম্বলিত পণ্য ব্যাবহার করলে কার্যকরীতা ভালো পাওয়া যায়।
সানস্ক্রিন ও সানব্লক পণ্য কতক্ষণ কিংবা কতদিন পরপর ব্যাবহার করা উচিত?
সানস্ক্রিন ও সানব্লক পণ্য সাধারণত ২ ঘন্টা পরপর ব্যাবহার করা উচিত। মেকআপ করলে মেকআপের আগে এই পণ্য প্রয়োগ করা উচিত এবং দুই ঘন্টা অন্তর অন্তর পুণরায় ব্যাবহার করা উচিত। তবে কোনো কারণে মুখ ধোয়ার প্রয়োজন হলে কিংবা বেশি ঘামলে দুইঘন্টার আগেও এগুলো ব্যাবহারের প্রয়োজন হতে পারে।
কোন ত্বকের জন্য কোন সানস্ক্রিন ও সানব্লক পণ্য ব্যাবহার করবেন?
ত্বকের ধরন না জেনে না বুঝে আন্দাজে প্রোডাক্ট ব্যাবহার করে ত্বকের বারোটা বাজিয়েছে এমন লোকের সংখ্যা কম নয়। তাই এই মারাত্মক ভুল ভুলেও করবেন না। চলুন তবে জেনে নেই কোন ত্বকের জন্য কোন কোনটি ব্যাবহার করবেন-
- স্বাভাবিক ত্বক: এক্ষেত্রে আপনি যেকোনো ভালো ব্যান্ডের এবং ওয়াটারপ্রুফ প্রোডাক্ট ব্যাবহার করতে পারেন।
- শুষ্ক ত্বক: শুষ্কতা বেশি থাকলে সাধারণত অয়েল বেজড কিংবা গ্লিসারিনযুক্ত পণ্য ব্যাবহার করা উচিত।
- তৈলাক্ত ত্বক: তৈলাক্তভাব ও তেল চিটচিটে মুখে সাধারণত ম্যাট এবং ওয়াটারপ্রুফ পণ্য ব্যাবহার করা উচিত।
- মিশ্র ত্বক: মিশ্র ধরনেও ম্যাট এবং ওয়াটারপ্রুফ সানস্ক্রিন ও সানব্লক পণ্য ব্যাবহার করা উচিত। তবে আপনি গ্লিসারিনযুক্ত ম্যাট ধরনের বেছে নিতে পারেন মিশ্র ত্বকের জন্য।
- সংবেদনশীল ত্বক: এই ধরনের ত্বকে এ ধরনের পণ্যের ব্যাবহার একান্তই আবশ্যক। ওয়াটারপ্রুফ ভালো ব্র্যান্ডের ও SPF-50+ সম্বলিত পণ্য সেনসিটিভিটিতে ভালো কাজ করে।
সানস্ক্রিন ও সানব্লক পণ্য ব্যাবহারের সঠিক নিয়মাবলীঃ
- উন্নতমানের টোনার ব্যাবহার করে তারপর ক্লিনজার দিয়ে পরিষ্কার করে ত্বকের ধরন অনুযায়ী ময়শ্চারাইজার ব্যাবহার করে তারপর এই পণ্য ব্যাবহার করুন;
- প্রতি দুইঘন্টা পরপর সানস্ক্রিন ও সানব্লক পুণরায় প্রয়োগ করুন;
- উন্নতমানের ব্র্যান্ডের পণ্য ব্যাবহার করুন;
- ত্বকের ধরন অনুযায়ী প্রোডাক্ট বাছাই করুন;
- সুইমিং পুলে নামার আগে অবশ্যই ওয়াটারপ্রুফ সানস্ক্রিন ও সানব্লক ব্যাবহার করুন;
- ঘুমানোর আগে তুলে ফেলার সময় ফেসিয়াল ওয়াইপ দিয়ে মুছে গোলাপজল অথবা শশার রস দিয়ে কিছুক্ষণ রেখে ভালোমানের ফেসওয়াশ কিংবা ক্লিনজার ব্যাবহার করুন;
- তীব্র রোদে বের হওয়া থেকে যথাসম্ভব বিরত থাকুন;
- মেকআপ করার ক্ষেত্রে মেকআপ পণ্য ব্যাবহারের পূর্বে এই সূর্যরশ্মি প্রতিরোধক লাগিয়ে নিন;
- বাইরে বের হবার কমপক্ষে আধাঘন্টা আগে সানস্ক্রিন ও সানব্লক পণ্য প্রয়োগ করবেন;
- রোদ থাকুক কিংবা না থাকুক, সেকোনো ঋতুই হোক না কেনো অবশ্যই ব্যাবহার করবেন;
সানস্ক্রিন ও সানব্লক পণ্য ব্যাবহারের ক্ষেত্রে কি কি সতর্কতা অবলম্বন করবেন?
- শরীরের বা মুখের যেকোনো ছোট অংশে অল্প পরিমানে পণ্যটির স্যাম্পল টেস্টার লাগিয়ে প্যাচ টেস্ট করে নিন;
- পণ্যের গায়ে লেখা মেয়াদের ডেট দেখে নিতে ভুলবেন না;
- পণ্যের গায়ে লেখা উপাদানসমূহ দেখে নিন যাতে আপনার কেনা পণ্যে আপনার এলার্জি হতে পারে এমন কোনো উপাদান না থাকে;
- বাচ্চাদের থেকে দূরে রাখুন। এমনকি খেলার জন্যেও বাচ্চাদের হাতে এসব পণ্য দেবেন না;
- দুই ঘন্টা পার হলেই পুনরায় ব্যাবহার করতে ভুলবেন না;
- পণ্যের QR কোড দেখে যাচাই করে কিনুন; নকল পণ্য থেকে দূরে থাকুন;
- কমদামী সানস্ক্রিন ও সানব্লক পণ্য ভুলেও কিনবেন না;