ডায়াবেটিস হলে কী খাবেন না? ডায়াবেটিসে রোজা রাখা কী নিরাপদ?

ডায়াবেটিস হল শরীরের একটি গুরুতর অবস্থা। ডায়াবেটিস হলো ইনসুলিনের ঘাটতি। রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হলে, ডায়াবেটিস হয়। শরীরে বেশ কিছু অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়। ডায়াবেটিস, আধুনিক যুগের এক অন্যতম সমস্যা। ছোট বড় অনেকেই এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। সকাল সন্ধ্যায় একদল লোককে আপনি নিয়ম করে  হাঁটাহাঁটি করতে দেখবেন। আপনার আশেপাশের এই লোকগুলোই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। কেউ বেশি মিষ্টি খাবার খেয়ে, কেউ অলস জীবন কাটিয়ে, কেউবা বংশগত কারণে এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। যারা সারাক্ষণ বসে বসে কাজ করেন তারাও রয়েছেন এ রগের ঝুঁকিতে। আপনি জানেন কী ডায়াবেটিস কেন হয়? ডায়াবেটিসের প্রকারভেদ কী? ডায়াবেটিসের প্রাথমিক লক্ষণগুলো কী ?  ডায়াবেটিস রোগীরা কী খাবেন? ডায়াবেটিস রোগীরা কী খাবেন না? ডায়াবেটিস রোগী হঠাৎ অসুস্থ হলে কী করবেন? রোজায় ডায়াবেটিস রোগীর খাদ্য ও সতর্কতা সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিই। 

ডায়াবেটিস কেন হয়?

আমাদের শরীর গ্রহণকৃত খাদ্যের শর্করাকে ভেঙে চিনিতে রূপান্তরিত করে। অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন নিঃসৃত হয়। যা আমাদের শরীরের কোষগুলোকে নির্দেশ দেয় চিনিকে গ্রহণ করার জন্য। এই চিনি কাজ করে শরীরের জ্বালানী বা শক্তি হিসেবে।

শরীরে যখন ইনসুলিন তৈরি হতে পারে না অথবা এটা ঠিক মতো কাজ না করে তখনই ডায়াবেটিস হয়। এবং এর ফলে রক্তের মধ্যে চিনি জমা হতে শুরু করে।

ডায়াবেটিসের প্রকারভেদ

ডায়াবেটিসের প্রকারভেদঃ 

ডায়াবেটিস প্রধানত দুই ধরনের, যেমন- টাইপ-ওয়ান ও টাইপ-২।

টাইপ ওয়ানঃ 

এই ধরনের ডায়াবেটিসে যারা আক্রান্ত তাদের অগ্ন্যাশয়ে যথেষ্ট ইনসুলিন উৎপন্ন হয় না । এ ক্ষেত্রে ইনসুলিন বা পুরোপুরি ওষুধের ওপর নির্ভর করতে হয়।

লক্ষণঃ

  • তীব্র তৃষ্ণা 
  • অতিরিক্ত প্রস্রাবের প্রবণতা
  • দ্রুত ওজন হ্রাস
  • প্রচণ্ড ক্ষুধা
  • দুর্বলতা বা ক্লান্তি
  • অস্বাভাবিক বিরক্তি
  • ঝাপসা দৃষ্টি
  • বমি বমি ভাব 
  • পেটে ব্যথা
  • অপ্রীতিকর গন্ধের অনুভূতি
  • চুলকানি

টাইপ টুঃ 

সাধারণত মধ্যবয়সী বা বৃদ্ধ ব্যক্তিরা টাইপ টু ধরনের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। বয়স কম হওয়া সত্ত্বেও যাদের ওজন বেশি এবং যাদেরকে বেশিরভাগ সময় বসে বসে কাজ করতে হয় তাদেরও এই ধরনের ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। বাংলাদেশে ৯৫ শতাংশ রোগী টাইপ-২ ধরনের।

লক্ষণঃ 

  • ধীরে গতিতে ক্ষতস্থান নিরাময় 
  • তীব্র তৃষ্ণা 
  • অতিরিক্ত প্রস্রাবের প্রবণতা
  • দ্রুত হারে ওজন হ্রাস
  • অপ্রীতিকর গন্ধের অনুভূতি 
  • হাতে এবং পায়ে ঝিনঝিন 
  • চুলকানি 
  • মূত্রনালীতে সংক্রমণ
  • ঝাপসা দৃষ্টি
  • মেজাজ পরিবর্তন
  • মাথাব্যথা
  • মাথা ঘোরা 
  • বগল এবং ঘাড়ের কাছে কালচে ছাপ
ডায়াবেটিকসের প্রাথমিক লক্ষণগুলো কী

ডায়াবেটিকসের প্রাথমিক লক্ষণগুলো কী ? 

আপনার মানবদেহে কিংবা নিত্যদিনের জীবনযাপনে যে সব লক্ষণ দেখলে  বুঝবেন আপনি ডায়াবেটিকসের ঝুঁকিতে আছেন –

  • স্বাভাবিকের চাইতেও ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া। বিশেষ করে রাতের বেলায়।
  • পিপাসা লাগা। 
  • শরীর দুর্বল লাগা ও ঘোর ঘোর ভাব আসা।
  • ক্ষুধা বেড়ে যাওয়া ।
  • ক্লান্ত বোধ করা। 
  • কোন কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া। 
  • সময়মতো খাওয়া-দাওয়া না হলে রক্তের শর্করা কমে হাইপো হওয়া। 
  • মিষ্টি জাতীয় জিনিসের প্রতি আকর্ষণ বেড়ে যাওয়া। 
  • শরীরে ক্ষত বা কাটাছেঁড়া হলেও দীর্ঘদিনেও সেটা না সারা। 
  • চামড়ায় শুষ্ক, খসখসে ও চুলকানি ভাব। 
  • বিরক্তি ও মেজাজ খিটখিটে হয়ে ওঠা। 
  • চোখে কম দেখতে শুরু করা।

ডায়াবেটিস রোগীরা কী খাবেন :

  • পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করতে হবে। 
  • অন্তত তিন ধরনের তাজা সবজি থাকতে হবে খাদ্যাভাসে রাখতে হবে। 
  • প্রতিদিন একই সময়ে খাবার খান। 
  • কম ফ্যাটযুক্ত দুধ পান করুন। 
  • প্রতিদিন কম করে ২০-২৫ গ্রাম কাঁচা পেঁয়াজ খান। 
  • খানিকটা দারচিনি খেতে পারেন। 
  • নিয়মিত পরিমাণমতো তাজা ফল খেতে হবে। 
  • মনে রাখতে হবে যতটা সম্ভব হারবাল চা পান করতে হবে, ক্যাফেইন চায়ের পরিবর্তে।
  •  আঁশযুক্ত গোটা শস্য খাওয়ার প্রবণতা বাড়াতে হবে।। ময়দার রুটি আর মিলে ছাঁটা চালের বদলে লাল আটার রুটি বা ঢেঁকিছাঁটা চালের ভাত খেলে ভালো।
  • কুমড়া, ঢেঁড়স, টমেটো, ব্রকোলি, বাঁধাকপি খাদ্যতালিকায় রাখুন । 
  • টমেটোর জুস কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। 
  • ব্রকোলিতে পাওয়া যায় সালফোরাফেন, যা এক ধরনের আইসোথিওসায়ানেট। যা রক্তে শর্করার পরিমাণ কমায়।  

ডায়াবেটিস রোগীরা কী খাবেন নাঃ 

  • কখনও বেশি পরিমাণে খাওয়া চলবে না। 
  • যেসব খাদ্য বা পানীয়তে চিনির পরিমাণ বেশি থাকে সেসব বর্জন করতে হবে। 
  • কাঁচা লবণ বর্জন করতে হবে। 
  • বেশি ভাজা ও তৈলাক্ত খাবার খাওয়া যাবে।
  • প্রতিদিন দু কাপের বেশি চা বা কফি।
  • দুধ খেতে হলে ফ্যাট কমিয়ে খেতে হবে।
  • পনির খেতে হবে ফ্যাট ছাড়া। 
  • ভাত, আলু, কলা এবং গাজর রক্তে চিনির পরিমাণ বাড়ায়। এই খাবার যত কম খাবেন, তত ভালো।
  • বাইরের প্যাকেটের খাবার বা বাইরের তৈরি খাবার এড়িয়ে চলতে হবে।
  • পানীয় বা কৃত্রিম জুস খাওয়া যাবে না এতে রক্তের চিনির পরিমাণ বাড়বে।
  • ধূমপান বা অ্যালকোহল গ্রহণ বর্জন করতে হবে।

রমজানে ডায়াবেটিস রোগীর রোজা রাখা কতোটা নিরাপদ?

 রমজান মাস হলো মুসলিমদের জন্য এক পবিত্র মাস।  রোজা পালন করা একজন মুসলিমের জন্য ফরজ। প্রতিটি ধর্মপ্রাণ মুসলিম রমজান মাসের পুরোটা জুড়ে রোজা রাখে, সংযম পালন করেন।  ডায়াবেটিস রোগীরা রোজা রাখতে পারবেন। তবে অনেকের ক্ষেত্রে ঝুঁকি থাকে। এজন্য সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। আসুন জেনে নিই, যারা রোযা রাখার ক্ষেত্রে ঝুঁকিতে আছেন তাঁদের সম্বন্ধে-                     

১. টাইপ-১ ডায়াবেটিস রোগী।

২. যাঁদের রমজানের আগে ৩ মাসের মধ্যে রক্তে সুগারের মাত্রা অনিয়ন্ত্রিত ছিল,  তাদের রোজা রাখা ঝুঁকিপূর্ণ।

৩. যাঁদের কিডনির সমস্যা রয়েছে । 

৪.যারা বেশি শারীরিক পরিশ্রম করেন। 

৫. অন্তঃত্ত্বা ডায়াবেটিস রোগী।

৬. খুব শারীরিক অসুস্থতা আছে এমন ডায়াবেটিস রোগী।

রোজায় ডায়াবেটিস রোগীর খাদ্য ও সতর্কতা

রোজায় ডায়াবেটিস রোগীর খাদ্য ও সতর্কতাঃ 

রোজা রাখার সময় ডায়াবেটিস রোগীদের কিছু সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে যেমন- 

১. দিনে অন্তত ২-৩ বার রক্তে সুগার মাপতে হবে। 

২. যারা ইনসুলিন নেন তারা অবশ্যই সুগার মেপে দেখবেন।

৩. ইফতার থেকে সেহেরিতে পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে।  কমপক্ষে ২ থেকে ২.৫ লিটার।

৪. সুষম খাদ্য গ্রহন করুন। 

৫. অতিরিক্ত তেল ও চর্বি জাতীয় খাবার পরিহার করতে হবে।

৬. সেহেরিতে বাদামি চালের ভাত, বাদামি আটার রুটি, যব খাওয়া উচিত। সঙ্গে সবজি, ডাল এবং আমিষ হিসেবে মাছ, মুরগি খাওয়া যাবে।

৭. টক জাতীয় ফল ও টক দই খাওয়া যেতে পারে।

৮. ইফতারে ভাজাপোড়া  খাবার বর্জন করতে হবে। 

৯. শরবতে চিনি ব্যবহার করা যাবে না।

১০. ফলের জুস খান। 

১১. তারাবির পর বাদাম, দুধ অথবা টক দই খেতে পারেন।

১২. ছোলার সঙ্গে ডিম, সালাদ খেতে পারেন।

ডায়াবেটিস রোগী হঠাৎ অসুস্থ হলে কী করবেন? 

  • প্রথমেই ডায়াবেটিসের রোগীর রক্তের শর্করার পরিমাণ পরীক্ষা করতে হবে। 
  • রক্তে শর্করা যদি বেশি হয় (১১ মিলিমোল/লিটার বা তার বেশি) তাহলে সতর্ক থাকতে হবে, যেন পানিশূন্যতা না হয়।
  • প্রচুর পানি পান করাতে হবে। 
  • দরকার হলে হাসপাতালে গিয়ে নরমাল স্যালাইন দিতে হবে।
  • স্যালাইনের গতি বিবেচনায় রাখতে হবে । 
  • আর যদি রক্তে চিনির মাত্রা ৪ মিলিমোল/লিটারের কম হয়, তাহলে ডায়াবেটিসের ওষুধ বা ইনসুলিন সাময়িকভাবে বন্ধ বা কমিয়ে দিতে হবে।
  •  রোগীকে চিনি গুলিয়ে শরবত খাওয়াতে হবে। 
  •  দ্রুত তাঁকে হাসপাতালে নিন।
  •  অসুস্থতার সময় এম্পাগ্লিফ্লোজিন জাতীয় ওষুধও বন্ধ করতে হবে।
  •  অসুস্থ অবস্থায় স্বল্পমেয়াদি ইনসুলিন সবচেয়ে ভালো।