নারী দিবসের ইতিহাসঃ বাংলাদেশে নারীর সমঅধিকার

“বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর”- জাতীয় কবি  কাজী নজরুল ইসলামের এই পংক্তি থেকেই নারীদের অধিকার, ত্যাগ, ও শ্রম নিয়ে  ধারনা পাওয়া যায়। কলাবতী শাড়ি থেকে নকশী কাঁথা, রান্নাঘর থেকে মাউন্ট এভারেস্ট। খেলার মাঠ থেকে মহাকাশযাত্রা। সবখানেই নারীদের বিচরণ। শত বাধা পেরিয়ে  নারীরা সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। নারীদের যদি উপযুক্ত সুযোগ, সম্মান দেওয়া হয় তাহলে যেকোনো দেশের উন্নয়ন সময়ের ব্যাপার মাত্র। আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির প্রসারের সাথে সাথে জীবনমাত্রায় যে পরিবর্তন এসেছে তাতে সামিল হচ্ছেন নারীরাও। সময়ের পরিক্রমায় বদলেছে নারীদের প্রতি সহিংসার ধরন, অবজ্ঞা করার কৌশল। এইসব সমস্যার বিপরীতে জনপ্রিয় হয়েছে “মি টু” আন্দোলন কিংবা হাল আমলের “অড ডট সেলফি”। আসুন জেনে নিই, নারী দিবস কেন প্রয়োজন, নারী দিবসের মতো কি আন্তর্জাতিক পুরুষ দিবসও আছে কিনা, এইসব বিষয় সম্পর্কে।

নারী দিবস কবে এবং কেন শুরু হয়

নারী দিবস কবে এবং কেন শুরু হয়? 

আন্তর্জাতিক নারী দিবসের ধারণাটি ১৯০৮ সালের শ্রম আন্দোলন থেকে উৎপন্ন হয়েছিল। সে সময় অসংখ্য মহিলা গার্মেন্টস শ্রমিকরা নিউইয়র্কের রাস্তায় মিছিল করে। ভাল বেতন, কম কাজের সময় এবং ভোটাধিকারের দাবিতে তারা রাস্তায় নামে। নারীর কাজের অধিকার, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের অবসানের জন্য  লড়াই শুরু সেই ইতিহাসকে সঙ্গে নিয়ে আজও পালিত হয় নারী দিবস। ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে বেশ কয়েকটি দেশে ৮ মার্চ নারী দিবস পালিত হতে লাগল। বাংলাদেশে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীনতার লাভের পূর্ব থেকেই এই দিবসটি পালিত হত। পরবর্তীতে ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। দিবসটি পালনের জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রকে আহ্বান জানায় জাতিসংঘ।

নারী দিবস কেন প্রয়োজন?

আফগানিস্তান, ইরান, ইউক্রেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো অনেক দেশে নারীরা তাদের নিজ নিজ দেশে যুদ্ধ, সহিংসতা, ও নিজেদের অধিকারের জন্য প্রতিনিয়ত লড়াই করছেন। আফগানিস্তানে তালেবান সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেখানে নারীদের জন্য উচ্চাশিক্ষা ও চাকরি নিষিদ্ধ করা হয়। এমনকি বাড়ির বাইরে যেতে হলেও বৈধ পুরুষ সঙ্গী নিয়ে যাওয়ার নিয়ম জারি করে তালেবান সরকার।

গত বছর সেপ্টেম্বরে ইরানে, ঠিকভাবে হিজাব না পরার অভিযোগে ২২ বছরের তরুণী মাহসা আমিনিকে গ্রেপ্তার করে তেহরানের পুলিশ। এরপর পুলিশি হেফাজতেই তার মৃত্যু হয়।  বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। সেই বিক্ষোভে নারীরা নিজেদের মাথার স্কার্ফ বা হিজাব খুলে, আগুনে পুড়িয়ে সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। সেই বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিলেন ইরানের পুরুষরাও। শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পশ্চিমের অনেক দেশেও নিজেদের অধিকারের জন্য লড়ছে নারীরা।

কীভাবে বিশ্বব্যাপী পালিত হয় অন্তর্জাতিক নারী দিবস

কীভাবে বিশ্বব্যাপী পালিত হয় অন্তর্জাতিক নারী দিবস? 

রাশিয়াসহ বিশ্বের অনেক দেশে আন্তর্জাতিক নারী দিবসে সরকারি ছুটি দেওয়া হয়। ৮ মার্চের আগে-পরের ৩/৪ দিন এসব দেশে  দেদারসে ফুলের বিক্রি হয়। চীনের অনেক প্রদেশে কাউন্সিলের বিবেচনায় ৮ মার্চ নারীদেরকে অর্ধেক দিনের ছুটি দেওয়া হয়। ইতালিতে এ দিনের শুরু হয় নারিকে ফুল দিয়ে অভিবাদনের মাধ্যমে।  দিনটি নারীদের ফুল দেওয়ার মাধ্যমে উদযাপিত হয়। ফুলের শুভেচ্ছা জানানোর এ ঐতিহ্যের উৎপত্তি  সম্পর্কে সঠিক জানা যায়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এটি রোমে শুরু হয়েছিল বলে মনে করা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মার্চ মাসকে নারীদের ইতিহাসের মাস বলে মনে করা হয়। প্রতিবছর আমেরিকান নারীদের কৃতিত্বের স্বীকৃতি স্বরূপ মার্কিন প্রেসিডেন্ট একটি ঘোষণাপত্র জারি করেন এই দিনে। আন্তর্জাতিক নারী দিবস বিশ্বব্যাপী পালিত হয় । বাংলাদেশে নারী দিবস পালিত হয় সাড়ম্বরে। দিন ভর সেমিনার, সাংস্কৃতিক আয়োজন, জয়িতাদের সম্মাননা প্রদান বিভিন্ন অনুষ্ঠান পালিত হয়। ছায়ানট থেকে মহিলা সমিতি , সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সবাই নিজ উদ্যোগে এই দিনে নারিদের অদম্য পথচলাকে উৎসাহিত করে। প্রতিবছর নারী দিবস পালিত হয় ৮ মার্চ। ২০২৪ এর নারী দিবসের প্রতিপাদ্য হলো “ নারীর সমঅধিকার, সমসুযোগ, এগিয়ে নিতে হোক বিনিয়োগ।

বাংলাদেশের নারীরা কতোটা এগোল

বাংলাদেশের নারীরা কতোটা এগোল? 

বাংলাদেশের নারী নিশাত মজুমদার ও ওয়াসফিয়া নাজরীন  বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ এভারেস্টে আরোহণ করেছেন। মৌলভীবাজারের রাধাবতী দেবী কলাগাছের সুতো দিয়ে “কলাবতী শাড়ি” তৈরি করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন।  ময়মনসিংয়ের কলসিন্দুরের মেয়েরা নেপালকে ৩-১ গোলে হারিয়ে জিতে নেয় সাফ চ্যাম্পিয়ন শিরোপা। বাংলাদেশের নারী ফুটবল দল পাকিস্তানকে ১২ গোল দিয়েছে, সার্ক শিরোপা জয় করেছে। আমাদের নারী ক্রিকেট দল চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, কিন্তু পুরুষ ক্রিকেট দল পারেনি। আজকে বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী নারী, বিরোধীদলীয় নেত্রী নারী, সংসদ নেতা নারী, সংসদ উপনেতা নারী, শিক্ষামন্ত্রী নারী। নারীর যে ক্ষমতায়ন বাংলাদেশে হয়েছে, পৃথিবীর আর কোনো দেশে গত এক দশকে এভাবে হয়নি।  এভাবেই শত বাধা বিপত্তি পেরিয়ে নারীয়ে এগিয়ে চলছে অদম্য গতিতে। 

বর্তমানে সারাদেশের ৮ হাজারের অধিক ডিজিটাল সেন্টারগুলোয় প্রায় ১৬ হাজারের অধিক উদ্যোক্তা কাজ করছেন, যার অর্ধেকই রয়েছেন নারী উদ্যোক্তা। এসব ডিজিটাল সেন্টার থেকে ৩৬০ এর অধিক সরকারি-বেসরকারি সেবা খুব সহজে গ্রহণ করতে পারছেন নাগরিকরা। প্রতিমাসে ডিজিটাল সেন্টার থেকে গড়ে ৭০ লক্ষের অধিক সেবা প্রদান করা হচ্ছে। 

নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে ৭ম। স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত কর্মীদের প্রায় ৭০ শতাংশই নারী। তৈরি পোশাক আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।  তৈরি পোশাক খাতে ৮০ শতাংশের বেশি নারী কর্মী নিয়োজিত রয়েছেন। 

বাল্যবিবাহ নারীদের অগ্রযাত্রায় অন্যতম প্রতিবন্ধক। বাল্যবিবাহের কারণে অনেক মেয়েই নিজেদেরকে বিকশিত করতে পারে না আপন আলোয়। ২০১৮-২০২১ সালের ৯৯৯ কলগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৮ সালে মাত্র ১০ শতাংশ নারী কল দিয়েছিল বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের জন্য। বাকি ৯০ শতাংশ কিন্তু পুরুষ কল দিয়েছে। ২০১৯ সালেও নারীর কল ছিল ১০ শতাংশ, ২০২০ সালে বেড়ে ২১ শতাংশ এবং ২০২১ সালে সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৬ শতাংশে। তার মানে , এখনকার আধুনিক প্রজন্মের মেয়েরা সচেতন হচ্ছে। নারীরা ঘরের কাজ সামলিয়ে কর্মক্ষেত্রেও সমানতালে পরিশ্রম করছেন। সামনের দিনগুলোতে নারীরা সমাজ ও পারিপার্শ্বিক উন্নয়নে যে আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

নারী দিবসের রঙ বেগুনি কেন

 নারী দিবসের রঙ বেগুনি কেন? 

বিশ্ব শান্তি দিবসের রঙ সবুজাভ নীল, বিশ্ব শ্রম দিবস বা মে দিবসে লাল, পরিবেশ দিবসের রঙ সবুজ  প্রতিটি দিবসে আলাদা রঙের প্রতীক হওয়ার পেছনে আছে ভিন্ন ইতিহাস।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস মূলত বেগুনির সঙ্গে সাদার মিশেল কিংবা শুধুই বেগুনি। নারী দিবসের বেগুনি রং ভেনাসের। যা কি না নারীরও প্রতীক। বেগুনি রঙ নির্দেশ করে সুবিচার ও মর্যাদার। সবুজ আশার প্রতীক; আর সাদা বিশুদ্ধতার। যা দৃঢ়ভাবে নারীর সমঅধিকারের সঙ্গে জড়িত। বেগুনি রং এখন নারীবাদীদের প্রতিবাদের অনন্য প্রতীক।

নারী দিবসের মতো কি আন্তর্জাতিক পুরুষ দিবসও আছে?

নারী দিবসে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, নারীদের জন্য যেমন আলাদা দিবস আছে তেমন কী পুরুষ দিবসও আছে? অনেকেই জানেন না যে নারী দিবসেওর মতো পুরুষ দিবসও আছে। বিশ্বব্যাপী ১৯ নভেম্বর পুরুষ দিবস পালিত হয় । ১৯৯০ সালে প্রথম পুরুষ দিবস পালিত হয়; তবে এটি জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত নয়।