পহেলা বৈশাখ প্রতিটি বাঙালির কাছে এক অনন্য অনুভূতি, আবেগ। নতুন বছরকে স্বাগত জানানো আর পুরাতনকে বিদায়ের এই সন্ধিক্ষণ আসলেই অর্থবহ। পহেলা বৈশাখ , বাঙালি সংস্কৃতির পরিচায়ক ও ধারক। পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষ সুপ্রাচীন বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ। এটি কোটি বাঙালির প্রাণের উৎসব। বাংলাদেশে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ব্যাপক সাড়ম্বরে পহেলা বৈশাখ পালিত হয়। এদিন সবাই বাড়িঘর পরিষ্কার রাখে। ব্যবহার্য জিনিসপত্র ধোয়ামোছা করে, বাড়িঘর সুন্দর করে সাজায়। এরপর গোসল করে নতুন জামাকাপড় পরে। এ দিনটিতে ভাল খাওয়া, ভাল থাকা এবং ভালো পরতে পারাকে লোকজন ভবিষ্যতের জন্য মঙ্গলজনক মনে করতো। তবে অনেক বাঙালিই জানেন না এই পহেলা বৈশাখ উৎসব কবে থেকে শুরু হয়েছিল? কে এর প্রচলন করেছিলেন ? পান্তা ভাত-ইলিশ কিভাবে পহেলা বৈশাখের ট্রেন্ডে পরিণত হলো? পহেলা বৈশাখের ইতিহাস কী ? পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে হালখাতা কী সমানভাবে জনপ্রিয়? ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা পহেলা বৈশাখ কিভাবে পালন করেন? আসুন জেনে নিই বিস্তারিত উত্তর।
পহেলা বৈশাখের ইতিহাসঃ
- ১৫২৬ সাল, পানিপথের প্রথম যুদ্ধ। সম্রাট বাবরের হাত ধরে ভারতবর্ষে মুঘল সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন হিজরী পঞ্জিকা অনুসারে কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করা হতো। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সাথে মিলত না। এতে অসময়ে কৃষকদেরকে খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য করতে হত। খাজনা আদায়ের লক্ষ্যে মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। তিনি মূলত প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনার আদেশ দেন।
- বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌর সন এবং আরবি হিজরী সনের উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ই মার্চ বা ১১ই মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ই নভেম্বর, ১৫৫৬) থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে “বঙ্গাব্দ” বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়।
- আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের খবর প্রথম পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। এরপর আবার পহেলা বৈশাখ উদযাপনের খবর পাওয়া যায় ১৯৩৮ সালে। তবে ১৯৬৭ সনের আগে ঘটা করে পহেলা বৈশাখ পালনের রীতি জনপ্রিয় হয়ে উঠেনি। ১৯৮৮ সালের ১৯ জুন থেকে আমরা বাংলা একাডেমীর সুপারিশ করা পঞ্জিকা গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি অনুসারে ১৪ই এপ্রিল পহেলা বৈশাখ পালন করা হয়। আকবরের সময়কাল থেকেই পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন শুরু হয়।
- রমনার বটমূলে ১৩৭২ বঙ্গাব্দ থেকে পহেলা বৈশাখের উৎসবের আয়োজন করে আসছে ছায়ানট।
পহেলা বৈশাখের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিঃ
পহেলা বৈশাখের রীতিনীতি, উৎসব আবহমান বাংলার এক অনন্য সংযোজন। শহর থেকে গ্রামে, দেশ থেকে বিদেশে সব বাঙালিই মেতে উঠে আনন্দ উল্লাসে। তরুণদের গায়ে লাল-সাদা পাঞ্জাবী থাকে, তরুণীরা শাড়ি পরে। খোঁপায় থাকে ফুল, হাতভর্তি কাচের চুড়ি। বাচ্চারা রঙিন জামা পরে মেলায় যাওয়ার বায়না ধরে। বাড়িতে অতিথি আপ্যায়নে থাকে দই-মিষ্টি, বিন্নি ধানের খৈ, মোয়া, সন্দেশ, ভাত, তরকারি, ডাল, পান্তাভাত। থাকে হরেক রকম ভর্তা, ইলিশ মাছ ভাজি, ঠান্ডা পানীয় ইত্যাদি । পহেলা বৈশাখের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বিস্তৃতি ব্যাপক। আসুন এখন জেনে নিই দেশীয় কিছু সংস্কৃতি সম্পর্কে যা নববর্ষে পালিত হয়।
পহেলা বৈশাখ ও মঙ্গল শোভাযাত্রাঃ
মঙ্গল শোভাযাত্রা পহেলা বৈশাখের কেন্দ্রবিন্দু। ঢাকার বৈশাখী উৎসবের একটি আবশ্যিক অংশ। সারা দেশের মানুষের চোখ থাকে এই মঙ্গল শোভাযাত্রার উপর। এর থিম নিয়ে আলোচনা সমালোচনা হয় প্রতিবছরই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে পহেলা বৈশাখের সকালে এই শোভাযাত্রাটি বের হয়। শহরের বিভিন্ন সড়ক ঘুরে পুনরায় চারুকলা ইনস্টিটিউটে এসে শেষ হয়। এই শোভাযাত্রায় গ্রামীণ জীবন এবং আবহমান বাংলাকে ফুটিয়ে তোলা হয়। শোভাযাত্রায় সকল শ্রেণী-পেশার বিভিন্ন বয়সের মানুষ অংশগ্রহণ করে। শোভাযাত্রার জন্য বানানো হয় বিভিন্ন রঙের মুখোশ ও বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিকৃতি। ১৯৮৯ সাল থেকে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা পহেলা বৈশাখে চালু রয়েছে।
ঢাকা রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণঃ
ঢাকায় পহেলা বৈশাখের মূল অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের সঙ্গীতানুষ্ঠান। পহেলা বৈশাখ সূর্যোদয়ের পর পর ছায়ানটের শিল্পীরা সম্মিলিত কণ্ঠে গান গেয়ে নতুন বছরকে আহ্বান জানান। স্থানটির পরিচিতি বটমূল হলেও প্রকৃতপক্ষে যে গাছের ছায়ায় মঞ্চ তৈরি হয় সেটি বট গাছ নয়, অশ্বত্থ গাছ। ১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়ন ও সাংস্কৃতিক সন্ত্রাসের প্রতিবাদে ১৯৬৭ সাল থেকে ছায়ানটের এই বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা।
বৈশাখী মেলা :
বৈশাখ মাস মানেই মেলা। গ্রাম থেকে শহরে সব জায়গাতেই বৈশাখী মেলা বসে। তবে পার্থক্য থাকে গ্রামের আর শহুরে মেলার। বিভিন্ন জেলায় হয় শত বছরের পুরোনো মেলা। বাঁশ-বেতের তৈজস আর নানা জাতের খেলার সামগ্রী। নারকেল মুড়কিসহ আরো কত কী থাকে এসব মেলায়, তার ইয়ত্তা নেই। মেলার সময়ে নৌকাবাইচ, লাঠিখেলা, কুস্তির আসর বসে।
বাংলাদেশের চট্টগ্রামে লালদীঘির ময়দানে অনুষ্ঠিত হয় জব্বারের বলিখেলা। আর বর্ষবরণের এ মেলা প্রবাসীদের জন্য হয় মিলনমেলা। দীর্ঘ ব্যস্ততার অবসরে বৈশাখী মেলা প্রবাসী বাঙালিদের দেয় অফুরন্ত আনন্দ। জাপানে প্রতি বছরই অনেক ঘটা করে বিশাল পরিসরে আয়োজন করা হয় বৈশাখী মেলা। জাপান প্রবাসীদের এ মিলনমেলার রেশটা থাকে সারা বছর। এ ছাড়া নিউইয়র্ক, লন্ডন, কানাডাসহ বিশ্বের অন্যান্য বড় বড় শহরে বসে বৈশাখী মেলার আয়োজন।
প্রাচীন বউমেলা ও ঘোড়ামেলাঃ
সোনারগাঁও এ ঈসা খাঁ এর আমলে বউমেলা হতো। সেখানে স্থানীয় বটতলায় কুমারী, নববধূ ও মায়েরা তাদের মনের ইচ্ছা পূরণে পূজা করতো। পাঁঠা বলি দেয়া হতো আগে। তবে এখন শান্তির বার্তার আশায় তারা দেবীর কাছে কবুতর বা পায়রা উড়িয়ে দেয়। এছাড়াও সোনারগাঁও এ ঘোড়ামেলারও প্রচলন ছিলো। লোকমুখে প্রচলিত আছে, আগে যামিনী সাধন নামের এক ব্যক্তি নববর্ষের দিন ঘোড়া চড়ে সবাইকে প্রসাদ দিত। তার মৃত্যুর পরে সেখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ বানানো হয় এবং পরবর্তীতে এটিকে কেন্দ্র করে মেলার আয়োজন হয়। আগে মাটির ঘোড়া রাখা হতো। এরপর থেকে মেলায় নাগর-দোলা, চরকা, ঘোড়ার আকারে ঘূর্ণী দোলনা রাখা হয়।
হালখাতা কী এখনও হয়?
হালখাতা প্রাচীন বর্ষবরণের একটা রীতি। আগের দিনের কৃষকেরা চাষাবাদ বাবদ চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সব খাজনা ও শুল্ক পরিশোধ করে দিত। এরপর দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখ ভূমির মালিকরা তাদের প্রজাসাধারণের জন্য মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করতেন। যা পরবর্তীতে ব্যবসায়িক পরিমন্ডলে ছড়িয়ে পড়ে। দোকানিরা সারা বছরের বাকির খাতা সমাপ্ত করার জন্য পহেলা বৈশাখের দিনে নতুন সাজে দোকান সাজায়। গ্রাহকদের মিষ্টিমুখ করিয়ে শুরু করেন নতুন বছরের ব্যবসার সূচনা। এ উৎসবগুলো সামাজিক রীতির অংশ হিসেবে পরিণত হয়েছে প্রতিটি বাঙালির ঘরে। এখনো গ্রামগঞ্জে নববর্ষে হালখাতার হিড়িক পড়ে বাজার, বন্দর ও গঞ্জে।
পান্তা-ইলিশ কবে এলো?
- পহেলা বৈশাখে বর্তমানে পান্তা-ইলিশ খাওয়া হলেও, আগে এর প্রচলন ছিল না। এইদিন ভালো খাবার খাওয়ার চল ছিল। যার মধ্যে অন্তর্ভূক্ত ছিল মাছ, মাংস, পোলাও।
- ধারণা করা হয়, পহেলা বৈশাখ বা বছরের প্রথম দিনে যদি ভালো খাবার খাওয়া হয়। ভাল পোশাক পরা হয় তাহলে বছরজুড়েই ভাল পোশাক, ভাল খাবার পাওয়া যাবে। অতীতে যারা দরিদ্র ছিল তারা গরম ভাত খেতো। গরম ভাতের সাথে থাকতো মৌরালা মাছ বা মলা মাছ। বর্তমানে পহেলা বৈশাখে খাবারের পদ পরিবর্তন হয়ে গেছে। এখনকার পহেলা বৈশাখ পান্তাবাঙালি সংস্কৃতিতে পান্তা দারিদ্র্যের প্রতীক।
- পান্তা একটি কর্পোরেট ধারণা এবং পহেলা বৈশাখে এটি আসে ২০০০ সালের পর। পান্তা ভাতের সাথে গরম কিছু হলে খেতে ভাল লাগে, এ চিন্তা থেকে ইলিশ পহেলা বৈশাখে যুক্ত হয়। এটি আসলে একটি সংযোজন। কিন্তু মূল বিষয়টি হলো পান্তা ভাত। বাঙালির ঐতিহ্য পান্তা নয়, এখনো গ্রামে পহেলা বৈশাখে যদি আমরা খোঁজ করি, গ্রামের মানুষ ওই দিন পান্তা খায় না, ওই দিন তারা ভাল খায়।
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পহেলা বৈশাখ উদযাপনঃ
- ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষেরাও পহেলা বৈশাখ উদযাপন করেন । উনারাও নিজেদের মতো করে নিজেদের উৎসবের রঙ ছড়ান। বিদায়ী বর্ষের চৈত্রসংক্রান্তির দিন এবং নতুন বর্ষের প্রথম দিনকে ঘিরে পাবর্ত্য জেলাসমূহে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের ঐতিহ্যবাহী উৎসব বৈসাবি’ উদযাপিত হয়। এর নামকরণ হয়েছে বৈসুক, সাংগ্রাই ও বিজু এই শব্দগুলোর আদ্যক্ষর থেকে। উল্লেখ্য, এ উৎসবকে চাকমারা বিজু, মারমারা সাংগ্রাই, ত্রিপুরারা বৈসুক বলে অভিহিত করেন। পুরো পার্বত্য এলাকায় এর সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে বৈসাবি’ নামে।
- পাহানরা বাস করে উত্তরবঙ্গের দিনাজপুর, বগুড়া ও নওগাঁয়। বৈশাখের দিন দুপুরে ভাতের সঙ্গে এরা ১২ ভাজা অর্থাৎ ১২ পদের তরকারি খায়। সন্ধ্যায় ঠাকুরকে ভক্তি দিয়ে নাচগানের আয়োজন করে ।
- বৈশাখের প্রথম প্রহরে সাঁওতালরা পুরনো বছরের পান্তা খেয়ে নতুন বছরের শুভ সূচনা করে। অতঃপর তাদের একদল তীর-ধনুক নিয়ে বেরিয়ে পড়ে শিকারে। অন্যরা দলবেঁধে নদীতে ছোটে মাছ ধরতে। মাছ মারাকে সাঁওতালরা বলে ‘হাকু গোজ চালাও’। নারীরা বাড়ি বাড়ি তেলের ও চিতই পিঠা তৈরি করতে থাকে। দুপুরে নানা পদ দিয়ে ভোজ সেরে নেয় এরা। এক সময় সাঁওতালরা বৈশাখে বিশ পদের রান্না দিয়ে ভোজ সারত। বিকাল থেকে সাঁওতাল গ্রামগুলোতে আয়োজন চলে ঝুমুর নাচের। রাতভর চলে প্রিয় পানীয় হাঁড়িয়া খাওয়া।
- চৈত্রের পরের দিনই বৈশাখ। কিন্তু বৈশাখ শুরু হলেই তুরিরা বন্ধ করে দেয় মাছ-মাংস খাওয়া। পুরো এক মাস এরা খায় শুধুই নিরামিষ। বৈশাখের প্রতি রাতে তুরি পাড়াতে চলে কীর্তন। কীর্তন করতে হয় শুধুই পুরুষদের। সৃষ্টিতত্ত্ববিষয়ক কীর্তনই অধিক গাওয়া হয়। এ সময় দূর-দূরান্ত থেকে নানা বিশ্বাসের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা ভিড় জমায় তুরি পাড়ায়। বৈশাখের শেষের দিকে এরা প্রতি বাড়ি থেকে চাল তুলে একত্রে খিচুড়ি রান্না করে খায়। ওইদিন আয়োজন হয় গান আর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নৃত্যের।