ব্যাথার সাথে পরিচিত নয় কিংবা জীবনে কোনোদিন ব্যাথার যন্ত্রনা পায়নি এমন মানুষ খুজে পাওয়া যাবে? ব্যাথা হতে পারে পেশিতে, অস্থিসন্ধিতে, মাথায়, বুকে, পেটে, হাত, পা, দাত এককথায় শরীরের যেকোনো স্থানে হতে পারে। এটা থেকে মুক্তির জন্য কেউ কেউ আবার হন চিকিৎসকের শরণাপন্ন। তবে আজ আপনাদের জানাবো ব্যাথা মুক্তির সহজ ও কার্যকরী উপায় যা কাজ করবে ম্যাজিকের মত। জানতে রাজি আছেন তো? চলুন তবে জেনে নেয়া যাক
ব্যাথা মূলত কত ধরনের হয়?
ব্যাথা শরীরের যেকোনো অঙ্গে, যেকোনো স্থানে যেকোনো কারণে হতে পারে। সেগুলোর ভিত্তিতে এটি নানা ধরনের হয়ে থাকে। জানতে চান খুটিনাটি? পড়ুন বিস্তারিত।
ব্যাথার প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে এটি কয়েক ধরনের হতে পারে। চলুন জেনে নেই সেই ধরনগুলো কি কি-
- বাতজনিত: আর্থ্রাইটিসের কারণে পেশীতে কিংবা হাড়ের জয়েন্টে ব্যাথা হতে পারে। একে বাতজনিত ব্যাথা বলা হয়৷ এক্ষেত্রে অয়েন্টমেন্ট কিংবা ব্যাথানাশক তেল ব্যাবহারে কাজ না হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
- থাইরয়েড সমস্যাজনিত: থাইরয়েড হরমোনের পরিমাণ বেড়ে কিংবা কমে গেলে থাইরয়েড হরমোনের প্রভাবে শরীরে ব্যাথা হতে পারে।
- ক্যালসিয়ামের ঘাটতিজনিত: ক্যালসিয়ামের ঘাটতি দেখা দিলে হাড়ের জয়েন্টে, হাড়ের ভেতর দিয়ে হাতে পায়ে এমনকি সমস্ত শরীরে এই যন্ত্রণা হতে পারে।
- স্ট্রেসজনিত: শারিরীক ব্যায়াম হঠাৎ অনেকদিন পর কিংবা বেশি সময় যাবৎ করলে, দুশ্চিন্তা করলে, ডিপ্রেশনে থাকলে শরীরের বিভিন্ন স্থানে বিশেষত মাথা, ঘাড় ও কাধের চারপাশে ব্যাথা হতে পারে।
- হরমোনজনিত: মেয়েদের অভ্যুলিউশন পর্যায়ে কিংবা পিরিয়ডের সময় যে ব্যাথা অনুভূত হয় তা হরমোনজনিত কারণে হয়ে থাকে।
- ভিটামিনের অভাবজনিত: কোনো কারণে শরীরে ভিটামিনের ঘাটতি দেখা দিলে, বিশেষত ভিটামিন বি এবং ডি এর ঘাটতি দেখা দিলে শরীরে ব্যাথা হতে পারে।
- আঘাতজনিত: কোনো কারণে আঘাতপ্রাপ্ত হলে কিংবা দুর্ঘটনায় পতিত হলে, আঘাতজনিত ব্যাথা হতে পারে।
স্থায়ীত্বের ভিত্তিতে ব্যাথা দুই ধরনের
- অস্থায়ী- কিছু ব্যাথা ক্ষণস্থায়ী অথবা শরীরের কোথাও রক্ত জমাট বেধে,ভিটামিনের অভাবে, আঘাত পেয়ে কিংবা ঘুমের সময় শক্ত খাটে ঘুমালে, এলোমেলো পজিশনে ঘুমালে সেই ক্ষেত্রে শরীরে ঐ স্থানে স্পর্শ করলেই যদি যন্ত্রণা অনুভূত হয় একে সাময়িক স্থায়ী ব্যাথা বলা যেতে পারে। আবার কিছু ক্ষেত্রে হাড়ের ভেতর দিয়ে, শিরার ভেতর দিয়ে অনুভূত হয় যা কিছুক্ষণ পর কিংবা ওষুধ প্রয়োগে চলে যায় সেগুলো অস্থায়ী কিংবা ক্ষণস্থায়ী ধরন।
- স্থায়ী – বাতজনিত, ক্যালসিয়াম ঘাটতিজনিত কিংবা কোনো রোগজনিত ব্যাথা সারাক্ষণ অনুভূত না হলেও দীর্ঘদিন ভোগান্তি দেয় এবং সাড়তে সময় নেয়। একে দীর্ঘস্থায়ী কিংবা স্থায়ী ধরন বলা যেতে পারে। যেমন বাতজনিত কারণ স্থায়ী ধরনের অন্যতম উদাহরণ।
স্থানের ভিত্তিতে ব্যাথা হওয়ার জায়গাগুলো হচ্ছে
- শরীর: এক্ষেত্রে শরীরের আংশিক জায়গাজুড়ে কিংবা সম্পূর্ণ শরীরেই হতে পারে। এটি ঘুমের সমস্যা, খাটের ধরন শক্ত হলে, মেঝেতে ঘুমালে, জার্নি করলে, কিংবা অন্যান্য নানাবিধ কারণে হতে পারে।
- মাথা: মাথার এক পাশে, পেছনে, মাঝখানে কিংবা সম্পূর্ণ মাথায় নানা কারণে হতে পারে। মাথায় একপাশে তীব্র যন্ত্রণা হলে তাকে মাইগ্রেন বলা হয়।
- বুক: বুকের ডানপাশে কিংবা বামপাশে গ্যাস্ট্রিকজনিত কারণে, হৃদরোগের কারণে, কিংবা কোনোভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হলে হতে পারে।
- পেট: হজমের সমস্যা, ডায়রিয়া, পিরিয়ড, গ্যাস্ট্রিক ইত্যাদি নানা কারনে এটি হতে পারে।
- কোমড়: বাতজনিত কারনে, থাইরয়েডের সমস্যায় কিংবা আঘাত পেলে হতে পারে।
- কাধ: কোন কারণে আঘাতপ্রাপ্ত হলে, ভারী বস্ত টানলে কিংবা হৃদরোগের কারনেও কাধে এই যন্ত্রণা হতে পারে।
- হাত ও পা: আঘাত পেলে, পেশিতে টান লাগলে, হরমোনের তারতম্যে, ভিটামিনের অভাবে, ক্যালসিয়ামের অভাবে, বাতজনিত কারণে ইত্যাসি নানা কারণে হাত ও পায়ে প্রদাহ হতে পারে।
কাদের ক্ষেত্রে ব্যাথা বেশি হয়?
হরমোনজনিত, থাইরয়েডজনিত কারণে কিংবা ভিটামিন ও ক্যালসিয়ামের ঘাটতি হলে অথবা আঘাতপ্রাপ্ত হলে যেকোনো বয়সের ব্যাক্তিরই এই সমস্যা হতে পারে। তবে বয়স্কদের ক্ষেত্রে, মেয়েদের মেনোপজের পর, ডায়াবেটিস থাকলে, বাতজনিত সমস্যা থাকলে শরীরে ব্যাথা বেশি হতে পারে কেননা বয়স বাড়ার সাথে সাথে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, হাড়ের ক্ষয় হয়, হাড় দূর্বল ও নমনীয় হয়ে পড়ে এবং এই ধরনের সমস্যা শুরু হয়।অপুষ্টিতে ভুগছে এমন ব্যাক্তিদেরও এই সমস্যা হতে পারে।
প্রধান কারণগুলো কি কি?
- হরমোনজনিত কারণে;
- ক্যালসিয়ামের ঘাটতি হলে;
- ভিটামিনের অভাবজনিত কারণে;
- বার্ধক্যজনিত কারণে;
- বাতজনিত সমস্যা থাকলে;
- জেনেটিক কারণে;
- অপুষ্টিতে ভুগলে;
- আঘাতপ্রাপ্ত বা দুর্ঘটনায় পতিত হলে;
- অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তায় থাকলে;
- স্ট্রেস বেশি নিলে;
- বেশি হাটাহাটি করলে;
- হঠাৎ অনেকদিন পর ব্যায়াম করলে;
- জার্নিতে ঝাকুনি বেশি হলে;
- কোনো জটিল রোগ থাকলে;
- ডায়াবেটিস বেড়ে গেলে;
- শক্ত বিছানায় কিংবা মেঝেতে ঘুমালে;
- ঘুমানোর সময় সঠিক পজিশনে না ঘুমালে কিংবা একদিকে কাত হয়ে দীর্ঘক্ষণ ঘুমালে;
- দীর্ঘসময় একটানা বিছানায় শুয়ে থাকলে;
- পেশীতে টান পড়লে;
- হাড়ের ক্ষয় হলে;
- ভারী কিছু বহন করলে;
- একটানা দীর্ঘসময় বসে থাকলে;
- অতিরিক্ত শারিরীক পরিশ্রম করলে;
ব্যাথা থেকে মুক্তি পেতে যে কাজগুলো অবশ্যই করবেন
- নিয়মিত হালকা ব্যায়াম করবেন;
- বেশি রাত না জেগে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়বেন;
- বেশি শক্ত কিংবা বেশি নরম এমন কোনো বিছানায়ই ঘুমাবেন না। খুব শক্ত নয় আবার খুব নরমও নয় এমন বিছানা নির্বাচন করুন;
- মেঝেতে ঘুমাবেন না;
- একটানা দীর্ঘসময় বসে থাকবেন না;
- দীর্ঘসময় ধরে ঘুমাবেন না এবং ঘুমের পজিশনে পরিবর্তন আনুন;
- বালিশ, তোশক নিয়মিত প্রতি মাসে একবার হলেও রোদে দিন;
- ক্যালসিয়াম ও ভিটামিনজাতীয় খাবার বেশি বেশি খেতে হবে;
- সহ্যক্ষমতার বেশি হলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন;
চলুন এবার জেনে নেই ব্যাথানাশক পণ্য কত ধরনের?
- ক্রিম: এরা সাধারণত ক্রিমের ফর্মে বা মলমের মত হয়ে থাকে৷ এটি যন্ত্রণার জায়গার ওপর আলতো ম্যাসাজ করে লাগাতে হয়।
- তেল: ব্যাথানাশক তেল উক্ত স্থানে রোজ ২-৩ বার মালিশ করলে মাত্র ৩-৪ দিনে কিংবা তারও আগেই হবে নিমিষেই দূর।
- বাম: মাইগ্রেন কিংবা বাহ্যিক যেকোনো ব্যাথায় বাম প্রচুর কার্যকরী। এতে থাকা প্রদাহবিরোধী ও দ্রুত কার্যকরী উপাদান আরাম দেয় মুহূর্তেই।
- অয়েন্টমেন্ট: পুডে গেলে, দূর্ঘটনায়, আঘাত পেলে, কেটে গেলে কিংবা আঘাতজনিত ক্ষেত্রে অয়েন্টমেন্ট দারুণ কাজ করে।
ব্যাথা দূর করার ঘরোয়া টিপস
- কর্পূর তেল: কর্পূর নারকেল তেলের মধ্যে রেখে দিলে কিংবা নারিকেল তেলের সাথে জ্বাল দিয়ে ফুটিয়ে ঠান্ডা করে সংরক্ষণ করতে পারেন। এই তেল ম্যাজিকের মত কাজ করে। কর্পূরের জাদুকরী গুনাগুণে যন্ত্রণা বিদায় হবে চিরতরে!
- গরম শেক: হট ওয়াটার ব্যাগ, কাপডের টুকরা হালকা গরম করে কিংবা গরম পানি বোতলে ভরে এই শেক উক্ত জায়গায় প্রয়োগ করুন। মনে রাখবেন পানি যেনো খুব গরম অবস্থায় না থাকে।
- ম্যাসাজ: কিছু কিছু ক্ষেত্রে হাতের জাদুকরী স্পর্শে অর্থাৎ ম্যাসাজে যন্ত্রণা দূর হয় নিমিষেই। ম্যাসাজের সময় হাতে নিয়ে নিতে পারেন সামান্য কপূর মেশানো নারিকেল তেল।
- নিয়মিত ব্যায়াম: হালকা হলেও রোজ একটু ব্যায়াম, একটু হাটাহাটি আপনাকে রাখবে চাঙা ও ফুরফুরে।
- নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন: বেশি রাত না জেগে, পর্যাপ্ত পানি পান, পর্যাপ্ত ঘুমানো এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম আর পরিমিত স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস আপনাকে রাখবে সুস্থ।
- বেশি পরিমানে ভিটামিন-সি: ভিটামিন সি তে থাকে প্রচুর এন্টিঅক্সিডেন্ট এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর শক্তি। তাই এই মারাত্মক যন্ত্রণার সাথে লড়তে খাদ্য তালিকায় ভিটামিন সি রাখতে ভুলবেন না।
- পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহন: পরিমিত প্রোটিন শক্তি এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এছাড়াও দুধ, ডিম, দুগ্ধজাত নানান খাবার ক্যালসিয়াম বাড়ায় যা হাড় ক্ষয় এবং প্রদাহে কার্যকরভাবে কাজ করে।