ব্ল্যাকহেডসের অত্যাচারে অতিষ্ট? ফেসিয়াল, স্ক্রাব, মাস্ক কিছুই করছে না কাজ? কাজ করবেও বা কিভাবে! আপনার ত্বকের ধরন জানেন তো? হ্যা ত্বকের সমস্যার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে আন্দাজে প্রসাধনী ও পণ্য ব্যাবহার। ব্ল্যাকহেডস দিয়ে ভরে গেছে নাকের চারপাশ? কালো ছোট বিন্দুগুলোকে বের করতে পারছেন না? চলুন আজ আপনাদের জানাবো ।
ব্ল্যাকহেডস বলতে কি বোঝায়?
ব্ল্যাকহেডস হচ্ছে লোমকূপের নিচে আটকে থাকা ছোট ছোট কালো তিলের মত দেখতে অংশ যা লোমকূপের ছিদ্র থেকে অতিরিক্ত তেল নিঃসরণ, ত্বকের মৃত চামড়া এবং মুখে জমে থাকা ধুলাবালির মিশ্রণে সৃষ্টি হয়ে থাকে। ব্ল্যাকহেডস কম বেশি সব ধরনের ত্বকেই দেখা যায় তবে তৈলাক্ত এবং মিশ্র ত্বকে অধিক সিবাম উৎপাদনের কারণে ত্বকে অতিরিক্ত তেল নিঃসৃত হয় যা লোমকূপের গোড়ায় ত্বকের মৃত চামড়ার অংশ, ধুলাবালি এবং মেকআপের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ আটকে ব্রণ এবং ব্ল্যাকহেডস সৃষ্টির সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।
ব্ল্যাকহেডস কেনো হয়?
ব্ল্যাকহেডস তখনই হয় যখন ত্বকে সিবাম উৎপাদনের পরিমাণ বেড়ে যায় এবং ত্বকের লোমকুপে মৃত চামড়ার নিচে ধুলাবালি, ময়লা আটকে যায়। বাংলাদেশের আবহাওয়ায় ব্ল্যাকহেডস তৈরী হওয়ার কিছু প্রধান প্রধান কারণ রয়েছে। চলুন জেনে নেই সেই কারণগুলো-
- সেবেসিয়াস গ্রন্থি থেকে সিবাম নামক অতিরিক্ত তৈলাক্ত পদার্থ বা তেল নিঃসরণ হলে;
- ত্বক অপরিচ্ছন্ন রাখলে;
- পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি না খেলে;
- অধিক পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট খেলে;
- চিনিযুক্ত খাবার বেশি গ্রহন করলে;
- পর্যাপ্ত ঘুম না হলে;
- জন্মগত ও জিনগতভাবে তৈলাক্ত কিংবা মিশ্র ত্বকের অধিকারী হলে;
- ধুলাবালি, ব্যাকটেরিয়া কিংবা ছত্রাকের সংক্রমণে;
- নিম্নমানের প্রসাধনী ব্যাবহার করলে;
- অপরিষ্কার মেকআপ ব্রাশ ব্যাবহার করলে মেকআপের উচ্ছিষ্ট গুড়ো লোমকূপের ছিদ্র আটকে ত্বকের মৃত চামড়ার সাথে যুক্ত হলে;
- ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায়;
- ভাজাপোড়া ও তৈলাক্ত খাবার গ্রহন করলে;
- অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করলে;
ব্ল্যাকহেডস ত্বকের কোথায় কোথায় হতে পারে?
ব্ল্যাকহেডস সাধারণত নাকে, নাকের আশেপাশে, থুতনীতে, গালে, চিবুকে, কপালে ও ঠোটের আশেপাশে কিংবা কিনারায় হতে পারে। ছোট্ট দানাদার তিলের মত কালোবর্ণের অংশগুলো মুখের সৌন্দর্যের বারোটা বাজিয়ে ত্বকের স্বাস্থ্য নষ্ট করে দেয়।
ব্ল্যাকহেডস দূর করতে যে কাজগুলো করতে ভুলবেন না
- মুখে দিনে অন্তত দুইবার ফেসওয়াশ ব্যাবহার করা;
- উন্নতমানের ও তৈলাক্ত ত্বকের উপযোগী প্রসাধনী এবং পণ্য ব্যাবহার করা;
- নকল, সস্তা এবং নিম্নমানের পণ্য কেনা থেকে বিরিত থাকা;
- মুখে অতিরিক্ত তেল নিঃসরণ হলে ব্লটিং পেপার, টিস্যু, ফেসিয়াল ওয়াইপ কিংবা ফেসিয়াল ওয়াশ বা ক্লিনজার দিয়ে তা পরিষ্কার করা;
- ত্বক যাতে রুক্ষ না হয়ে যায় সেজন্য তৈলাক্ত ত্বকের উপযোগী মউশ্চারাইজার ব্যাবহার করা;
- বেশি পরিমানে পানি পান করা;
- রাতে মুখে নারকেল তেল মেখে ঘুমিয়ে সকালে ক্লিনজার দিয়ে পরিষ্কার করা;
- সীমীত পরিমানে শর্করা ও মিষ্টিজাতীয় খাবার গ্রহণ করা;
- ভারী মেকআপ থেকে যথাসম্ভব বিরত থাকা;
- রাতে ঘুমানোর আগে অবশ্যই মেকআপ তুলে ফেলা;
- তীব্র রোদে বাইরে দীর্ঘসময় না থাকা;
- পর্যাপ্ত ঘুমানো;
- তৈলাক্ত ত্বকের উপযোগী ক্ষতিকর উপাদানমুক্ত পণ্যের ব্যাবহার করা;
- সকালে উঠেই ব্লটিং পেপার বা টিস্যু দিয়ে অতিরিক্ত তেল শুষিয়ে নেয়া;
- ত্বকের যত্ন নেয়া;
- ধুলাবালিযুক্ত পরিবেশ থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকা;
- কার্যকরী উপাদানসমৃদ্ধ ফেসিয়াল মাস্ক এবং এক্সফোলিয়েটর ব্যাবহার করা;
৩৩টি ঘরোয়া সমাধানে ব্ল্যাকহেডসকে বলুন বিদায়!
শুষ্ক, তৈলাক্ত ও সংবেদনশীল ত্বকের ব্ল্যাকহেডস দূর করার জন্য সর্বমোট ৩৩ টি কার্যকরী ঘরো উপায় নিয়ে আজ কথা বলবো আপনাদের সাথে। চলুন দেখে নেই প্যাকগুলো যা ম্যাজিকের মতো দূর করবে ব্ল্যাকহেডস।
শুষ্ক ত্বকের জন্য
- মধু, কফি গুড়া এবং চিনি: মধু, কফি গুড়া এবং চিনি একত্রে মিশিয়ে ব্ল্যাকহেডসের ওপর লাগিয়ে বৃত্তাকারে ম্যাসাজ করুন, ২০ মিনিট মুখে রেখে তারপর ধুয়ে ফেলুন।
- মধু, লেবুর রস এবং চিনি: লেবুর রসে আছে প্রদাহ থেকে মুক্তির কার্যকরী উপাধান। মধু ত্বক মসৃণ করে এবং চিনি খুব ভালো এক্সফোলিয়েটরের কাজ করে। মিশ্রণটি মুখে লাগিয়ে কিছুক্ষণ রেখে ধুয়ে ফেলুন।
- তরমুজের রস, চিনি ও মধু: এই ত্রয়ের সমন্বয়ে তৈরী প্যাকেজটি ব্ল্যাকহেডস দূর করতে এবং স্ট্রেস কমাতে ভীষণ কার্যকরী।
- ডিমের সাদা অংশ এবং মধু: ডিমের সাদা অংশ এবং মধুর প্যাকটি ব্ল্যাকহেডস দূর করার পাশাপাশি ত্বক মসৃণ করতে সহায়তা করে।
- কমলার খোসা গুড়া ও মধু: কমলার খোসা গুড়ার সাথে মধু মিশ্রিত করে ব্ল্যাকহেডসের ওপর লাগিয়ে বৃত্তাকারে ম্যাসাজ করুন। ১৫-২০ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন।
- বেকিং সোডা, কাচা দুধ ও লেবু: এই তিনটি উপাদান মিশ্রিত করে ব্ল্যাকহেডসে ব্যাবহার করে ২-৩ মিনিট ম্যাসাজ করে ১০ মিনিট মুখে রেখে ধুয়ে ফেলুন।
- এলোভেরা: এলোভেরার মাঝখানে জেলির মত অংশ তুলে ব্ল্যাকহেডসের ওপর লাগিয়ে বৃত্তাকারে ম্যাসাজ করুন। সারা রাত রেখে দিন। সকালে ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুইয়ে ফেলুন।
- দারুচিনি গুড়া, লেবু ও মধু: মিশ্রণটি মুখে লাগিয়ে ম্যাসাজ করে রেখে দিন ২০ মিনিট। এরপর ধুয়ে ফেলুন।
- নারকেল তেল ও কফি গুড়া: এই মিশ্রণটি বেশ কার্যকরীভাবে ব্ল্যাকহেডস দূর করে ত্বকের মসৃণতা ও আর্দ্রতা বজায় রাখে।
- ওটমিল, দই এবং অলিভ অয়েল: এই উপাদানগুলো মিশ্রিত করে ব্ল্যাকহেডসের ওপর লাগিয়ে বৃত্তাকারে ম্যাসাজ করুন ৫-৭ মিনিট। এরপর ধুয়ে ফেলুন ফেস ওয়াশ দিয়ে।
- টি ট্রি অয়েল, নারকেল তেল এবং এলোভেরা জেল: এই তিনটি উপাদান একত্রে ভালোভাবে মিশিয়ে রাতে মুখের ওপর বিশেষ করে ব্ল্যাকহেডসের জায়গাগুলোতে বেশি ঘন করে প্রয়োগ করুন। সকালে সুন্দরভাবে ধুয়ে ফেলতে হবে।
- মধু: মধু ব্ল্যাকহেডসের ওপর বৃত্তাকারে ম্যাসাজ করুন এরপর ১০ মিনিট রেখে কোনো এক্সফোলিয়েটর দিয়ে ধুয়ে নিন।
- ওটমিল গুড়া, দই এবং মধু: ওটমিল গুড়ার সাথে দুই চামচ দই এবং মধু মিশিয়ে ব্ল্যাকহেডসের ওপর লাগিয়ে ম্যাসাজ করে রেখে দিন ১৫ মিনিট ও ধুয়ে ফেলুন।
তৈলাক্ত ত্বকের জন্য
- বেকিং সোডা: বেকিং সোডা পানির সাথে মিশিয়ে পেস্ট তৈরী করে ব্ল্যাকহেডসের ওপরে প্রয়োগ করুন। ১০-১৫ রেখে ধুয়ে ফেলুন। মনে রাখবেন বেশি পরিমাণ বেকিং সোডা নে্যা যাবে না এবং দীর্ঘসময় মুখে রাখা যাবে না।
- চালের গুড়া, গোলাপজল ও লেবুর রস: এই তিনটি উপাদান একত্রে মিশিয়ে ব্ল্যাকহেডসের ওপর লাগিয়ে বৃত্তাকারে ম্যাসাজ করুন ৪-৫ মিনিট। এরপর ১০-১৫ মিনিট মুখে রেখে ধুয়ে ফেলুন।
- গরম পানির ভাপ ও মুলতানি মাটি: প্রথমে গরম পানির ভাপ নিন। এরপর মুখে মুলতানি মাটি লাগান। ২ মিনিট ম্যাসাজ করে রেখে দিন ২০ মিনিট। এরপর ক্লিনজার দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।
- টমেটো বাটা ও চিনি: টমেটো পেস্ট করে বা বেটে নিয়ে চিনি মিশিয়ে মুখে বৃত্তাকারভাবে আস্তে আস্তে ঘষুন। ১৫ মিনিট মিশ্রণটি মুখে রেখে ধুয়ে ফেলুন।
- তরমুজের রস, চিনি ও মধু: এই ত্রয়ের সমন্বয়ে তৈরী প্যাকেজটি ব্ল্যাকহেডস দূর করতে এবং স্ট্রেস কমাতে ভীষণ কার্যকরী।
- আটা: আটার নাম শুনে অবাক হলেন? নিত্যদিনের ব্যাবহার্য এই উপাদানটি হতে পারে ত্বকের জন্য খুবই ভালো এক্সফোলিয়েটরের কাজ করে।
- পেপারের আঠা বা গ্লু: পেপার গ্লু বা আঠা কাগজ দিয়ে নানারকম হ্যান্ডক্রাফট যেমন বানাতে সাহায্য করে, ঠিক তেমনি মুখের জন্য ভালো এক্সফোলিয়েটর। এই উপাদানটি ব্ল্যাকহেডসের ওপরে দারুণভাবে কাজ করে এবং চুম্বকের মত তুলে নিয়ে আসে মৃত চামড়ার ভেতর থেকে।
- কাচা দুধ, লবণ ও লেবু: এই মিশ্রণটি ব্ল্যাকহেডসের ওপর লাগিয়ে বৃত্তাকারে ম্যাসাজ করুন, রেখে দিন ১৫ মিনিট এরপর উষ্ণ গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।
- লবণ ও লেবু: লবণ ও লেবুর রস মিশিয়ে মুখে বৃত্তাকারে ম্যাসাজ করতে হবে ৫-৬ মিনিট। এরপর ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।
- টুথপেস্ট, লবণ এবং লেবুর রস: ব্ল্যাকহেডসের টুথপেস্ট লেবুর রস এবং লবণ মিশিয়ে ব্ল্যাকহেডসের ওপর লাগিয়ে নরম টুথব্রাশ দিয়ে বৃত্তাকারে ম্যাসাজ করুন। ১০-১৫ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন।
সংবেদনশীল ত্বকের জন্য
- কলার খোসা: কলার খোসা তো ফেলে দেয়ার জিনিস তাই না? অবাক হলেও সত্যি যে কলার খোসা ত্বকের মৃত চামড়া তুলে ফেলতে সাহায্য করে, র্যাশ বা লালভাব কমায় এবং ব্ল্যাকহেডস কার্যকরীভাবে দূর করে।
- গ্রিন টি ব্যাগ ও গোলাপ জ্বল: গ্রিন টি এর দুটি ব্যাগ গরম পানিতে জ্বাল করে ছেকে ঠান্ডা করে গোলাপ জল মিশিয়ে তারপর ত্বকে ব্ল্যাকহেডসের ওপর লাগিয়ে রেখে দিন ২০ মিনিট। এরপর স্ক্রাবার দিয়ে ম্যাসাজ করে মুখ ধুয়ে ফেলুন।
- হলুদ: হলুদকে আমরা প্রদাহরোধী এবং ত্বক উজ্জ্বলকারী উপাদান হিসেবে চিনে কিন্ত এটি দারুণভাবে ব্ল্যাকহেডস দূর করতে সাহায্য করে।
- পেট্রোলিয়াম জেলি: অবাক হয়ে গেলেন? জ্বী ঠিকই ধরেছেন, শীতকাল আসলেই যে পেট্রোলিয়াম জেলি ঠোটে লাগাই, সেটাই ব্ল্যাকহেডস দূর করে ম্যাজিকের মতো। এটি ত্বকের পোরস গুলোতে মৃত চামড়া আলগা করে উঠাতে এবং ত্বক মসৃণ করতে সাহায্য করে।
- পুদিনা পাতা ও হলুদ: পুদিনা পাতা বাটা ও হলুদ মিশিয়ে ত্বকে ব্যাবহার করে ৩০ মিনিট পর গোলাপ জল স্প্রে করে আলতো ম্যাসাজ করে ধুয়ে ফেলুন। দূর হবে ব্ল্যাকহেডস মুহুর্তেই।
- হলুদ গুড়া, চন্দন গুড়া ও কাচা দুধ: হলুদ এবং চন্দনের গুড়াকে কাচা দুধ মিশিয়ে পেস্ট বানিয়ে মুখে আলতো করে ব্ল্যাকহেডসের ওপর বৃত্তাকারে ম্যাসাজ করুন ৫-৭ মিনিট। এরপর ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।
- শশার রস এবং বাষ্প: শশার রস ত্বকে লাগিয়ে ১০ মিনিট রেখে গরম পানির বাষ্পের ভাপ নিন। ৪-৫ মিনিট ভাপ নেয়ার পর একটি স্ক্রাব ব্যাবহার করে আলতো ম্যাসাজ করে ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।
- হলুদ গুড়া, ধনেপাতা বাটা ও টকদই: হলুদ গুড়ার সাথে ধনেপাতা বাটা এবং টকদই মিশিয়ে মুখে ব্ল্যাকহেডসের ওপর প্রয়োগ করে ২০ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন।
- দুধ ও জয়ফল গুড়ো: জয়ফল গুড়োর সাথে দুধ মিশিয়ে ব্ল্যাকহেডসের ওপর লাগিয়ে বৃত্তাকারে ভালোভাবে ম্যাসাজ করুন। এরপর ১৫ মিনিট রেখে ফেস ওয়াশ এবং ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।
ব্ল্যাকহেডস দূর করার কার্যকরী পণ্যগুলো সম্পর্কে চলুন জেনে নেই
ব্ল্যাকহেডস যেহেতু তৈলাক্ত ও মিশ্র ত্বকে বেশি পাওয়া যায়, তাই অতিরিক্ত তেল দূরীভূত করে এমন পণ্যগুলো ব্ল্যাকহেডস দ্রুত দূর করতে সহায়তা করে। বাংলাদেশের উন্নতমানের ব্ল্যাকহেডস প্রতিরোধী ফেসওয়াশ ও ক্লিনজার, ফেসিয়াল মাস্ক, ফেসিয়াল স্ক্রাবগুলোর নাম হচ্ছে-