দিনদিন ত্বক রুক্ষ, শুষ্ক আর মলিন হয়ে যাচ্ছে? হারিয়ে ফেলছেন উজ্জ্বলতা? মৃত চামড়া আর ব্রণের কারণে চেহারার বারোটা বেজে যাচ্ছে? ব্রণের দাগ আর অযথাই ফেটে যাওয়ার দুশ্চিন্তা? চলুন জেনে নেই কিভাবে এক সপ্তাহে ফিরিয়ে আনবেন হারানো উজ্জ্বলতা! ভাবছেন আবোলতাবোল বকছি? একদমই না। ফেসিয়াল মাস্কের সতেজতায় ফিরিয়ে আনুন হারানো জৌলুস, কোমলতা, মোলায়েম, উজ্জ্বল আর স্বাস্থ্যকর। ভাবছেন সব চেষ্টা দিয়েও কেনো যায়নি ব্রণের দাগ, কেনো পান্নি আশানুরূপ ফল? আন্দাজে পণ্যের ব্যাবহার, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপন এবং অত্যাধিক দুশ্চিন্তা ও ডিপ্রেশনে ত্বকের হাল নাজেহাল তো হবেই। চলুন জেনে নেই কিভাবে মাত্র এক সপ্তাহেই হারানো জেল্লা ফিরবে, পাবেন কার্যকরী ফলাফল হাতে নাতে
ফেসিয়াল মাস্ক কি?
মাস্ক মানেই মুখোশ বোঝালেও এই মাস্ক করোনা প্রতিরোধকারী কিংবা সার্জিক্যাল ধরনের নয়, এটি উজ্জ্বলতা ফেরানোর জন্য প্রয়োগকৃত পণ্য বা ঘরে তৈরী মিশ্রণ যা মুখের ধুলাবালি, মেকআপের উচ্ছিষ্ট গুড়ো, মৃত কোষ কিংবা মৃত চামড়া, ব্ল্যাকহেডস ,হোয়াইটহেডস এবং ব্রণের দাগ দূর করে ফিরিয়ে আনে মসৃণতা, সতেজতা ও উজ্জ্বলতা। এটি অতিরিক্ত তেল দূর করে, সেইসাথে কোমল ও উজ্জ্বল করে এবং সকল দূষিত পদার্থ দূরে সরিয়ে দেয়।
ফেসিয়াল মাস্ক কত ধরনের হয়ে থাকে?
প্রয়োগের স্থানের ভিত্তিতে এরা চার ধরনের- ফেস মাস্ক, নোজ স্ট্রিপস, আই মাস্ক এবং শাওয়ার কিংবা বডি মাস্ক।
ফেস মাস্ক:
এটি মুখে ব্যাবহারের জন্য তৈরী করা হয়। এই পণ্য সব ধরনের ত্বকের উপযোগী হিসেবে বাজারে কিনতে পাওয়া যায়।
নোজ স্ট্রিপস:
চারকোল ফর্মূলা দিয়ে বানানো এটি নাকের ব্ল্যাকহেডস এবং ব্রণের পুজ বের করে আনে চুম্বকের মতো।
আই মাস্ক:
এটি স্পেশালি চোখের জন্য বানানো হয়েছে। এই পণ্য চোখের নিচের কালোদাগ, চোখের পাতাকে কোমল ও প্রশান্ত করে ঘুম আনয়নে সাহায্য করে।
শাওয়ার কিংবা বডি মাস্ক:
এই প্রোডাক্ট মুখমন্ডল, চোখ, নাক এবং শরীরের সর্বত্র ব্যাবহার করার জন্য বানানো হয়েছে। এটিজেল কিংবা ক্রিম ফর্মে আসে। ফেসিয়াল মাস্ক মূলত অনেক ধরনের। কিছু জনপ্রিয় ও বহুল ব্যাবহৃত ধরনের ব্যাপারে জেনে নেই চলুন-
পিলিং মাস্ক:
মৃত কোষ উঠাতে এর কোনো প্রতিদ্বন্দী নেই। এটি আর্দ্রতা ধরে রাখে, মৃত কোষ ও ধুলাবালি সরিয়ে ফেলে ত্বককে রাখে সতেজ ও মসৃণ। ফলে ব্রণের প্রবনতাও কমে যায়।
শীট মাস্ক:
এটি অত্যান্ত উপকারী। রুক্ষ শুষ্ক ত্বকে এই পণ্যটি যেমন আর্দ্রতা ফেরায়, ঠিক তেমনি অতিরিক্ত তেল শুষে নিয়ে তেল নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।
সেলুলোজ:
উদ্ভিদের বাকলের নিচের সেলুলোজ দিয়ে এ্টি তৈরী করা হয়। এটি PH নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে এবং আর্দ্রতা ধরে রাখে।
ক্লে:
এই পণ্য শীট আকারে কিংবা পিলিংহিসেবে পাওয়া যেতে পারে। এর ধরনের মধ্যে চারকোল ক্লে ধরনটি সবচেয়ে জনপ্রিয় ও কার্যকরী।
মাড মাস্ক:
এটি গুড়ো আকারে কিংবা ক্রিমের টেক্সচারে পাওয়া যেতে পারে। এদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় মুলতানি মাটি দিয়ে তৈরী ধরনটি।
চারকোল:
এটি চারকোল ক্লে কিংবা ব্যাম্বো চারকোল দিয়ে বাকনানো হতে পারে। এই প্রোডাক্টটি জেল, শীট, ক্লে, এক্সফোলিয়েটিং সব ধরনে পাওয়া যেতে পারে। একটিভ চারকোল স্কিন কেয়ারে ভীষণ গুরুত্বপূর্ন।
বাবল:
এটি মুখে বাবলের সৃষ্টি করে। এই প্রোডাক্টটি মুখের ধুলাবালি, ময়লা ও মেকআপের উচ্ছিষ্ট কণা দূর করে উজ্জ্বলতা বাড়ায়।
ডিটক্স:
এই পণ্যটি দূষিত পদার্থ ও ধুলিকণা চুম্বকের মত বের করে স্কিনকে রাখে ব্রণ ও জীবাণুর স্বংক্রমণ থেকে সুরক্ষিত।
ওভারনাইট ধরন:
এটি আর্দ্রতাভাব বজায় রাখে এবং ব্ল্যাকহেডসের কণাগুলোর গোড়া নরম করে যার ফলে আপনি সহজেই কোনো ক্লিনজার দিয়ে বের করে আনতে পারেন অবাঞ্ছিত ধুলাবালি ও মেকআপ কণা। এটি সকালে আপনাকে দিবে সতেজ ও মসৃণ অনুভূতি।
ক্রিম ধরন:
এটি ক্রিমের মত দেখতে এবং উজ্জ্বলতা ফেরাতে সাহায্য করে।
জেল:
জেলি ধরনের এই পণ্যটি মসৃণতা ও কোমলতা বজায় রেখে স্কিনকে করে তোলে উজ্জ্বল ও ব্রণের দাগ দূর করে।
থার্মাল:
এটি বায়ুর সংস্পর্শে আসলে বাষ্প বা স্টিমের মত কাজ করে এবং মৃত চামড়া নরম করে লোমকূপের ছিদ্র উন্মুক্ত করে ফলে স্কিন থাকে সুরক্ষিত ও আর্দ্র।
প্রদাহমুক্তকারী:
এর উপাদানগুলো প্রদাহ, জ্বালাপোড়া, চুলকানি, লালভাব, র্যাশ ও জেদি দাগ দূর করে আনে প্রাণবন্ত উজ্জ্বলতা।
ম্যাটিফাইং:
এটি তৈলাক্ত ধরনের জন্য দারুণ কার্যকরী। ম্যাটিফাইং ধরনটি অতিরিক্ত তেল শুষে নেয় এবং আর্দ্রতা বজায় রেখে স্কিনে উজ্জ্বলতা বৃদ্ধির কাজ করে।
ঘরে বসেই বানিয়ে নিন কার্যকরী মাস্ক
ডিমের সাদা অংশ ও দই:
এই দুইয়ের মিশ্রণ চমৎকার প্যাক তৈরী করে যা ধুলাবালি দূর করে ত্বক মসৃণ করে ও উজ্জ্বলতা বাড়ায়।
মুলতানি মাটি ও শসার রস:
শসার রসের সাথে মুলতানি মাটির পেস্ট বানিয়ে মুখে ব্যাবহার করুন। এই প্যাক ব্রণের দাগ বেশ দ্রুত ও কার্যকরভাবে দূর করে।
লেবুর রস ও দই:
এই মিশ্রণটি কোমলতা ফিরিয়ে আনে, ব্ল্যাকহেডস দূর করে এবং ক্লান্তিভাব দূর করে।
কমলার খোসা ও মধু:
এই মিশ্রণটি জেলের মতো আঠালো ধরনের মাস্ক তৈরী করে। এটি বয়সের কমনীয়তা ধরে রাখে এবং ঝুলে পড়া রোধ করে।
ডিম, মধু, আমন্ড অয়েল এবং দই:
এই চারের মিশ্রন খুবই উপকারী এবং উজ্জ্বলতা বাড়ায়।
ওটস এবং অ্যাভোক্যাডো:
ওটমিলের গুড়ো অ্যাভোক্যাডো পেস্ট তৈরী করে মুখে লাগান। ২০ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন।
অ্যাভোক্যাডো পেস্ট এবং মধু:
এই দুইটি মিশ্রনের প্যাক টানটান ভাব ধরে রাখে এবং ত্বক মসৃণ করে।
মধু ও গাজরের পেস্ট:
মধু ও গাজরের পেস্ট উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করতে এবং ব্রণের দাগ দূর করতে সহায়তা করে।
ওটমিল গুড়ো, কলা ও ডিম:
ওটমিল গুড়ো, পাকা কলার পেস্ট এবং ডিমের কুসুম দিয়ে প্যাক তৈরী করে মুখে লাগাতে পারেন। এটি উজ্জ্বলতা বাড়াবে এবং মসৃণ করবে সহজেই।
মধু ও ল্যাভেন্ডার অয়েল:
মধুর সাথে ল্যাভেন্ডার তেলের মিশ্রণ মুখের আর্দ্রতা বজায় রেখে ত্বককে করে তোলে প্রাণবন্ত।
মাশরুম ও শসার রস:
মাশরুমের নির্যাস ও শসার রস মুখে লাগিয়ে ২০ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন। এটি ত্বকের কোমলতা ফিরিয়ে আনতে দারুণ কাজ করে।
ফেসিয়াল মাস্ক ব্যাবহারের উপকারীতা কি কি?
- ত্বকে আটকে থাকা জেদি দাগ, ধুলাবালি, ময়লার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা, মেকআপ এর উচ্ছিষ্ট অংশ এবং ব্রণের নাছোড়বান্দা দাগ দূর করে;
- কোমল ও মসৃণ করে;
- ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখে;
- লোমকূপের আটকে যাওয়া ছিদ্র উমুক্ত করে ত্বককে ব্রণ প্রবণতা থেকে দূরে রাখে;
- ত্বকের প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগায় এবং সেইসাথে ত্বকে বার্ধক্যের ছাপ পড়তে দেয় না;
- ব্ল্যাকহেডস এবং হোয়াইটহেডস থেকে ত্বককে মুক্ত রাখে;
- ব্রণ থেকে ত্বককে দূরে রাখে এবং ব্রণের কালচে দাগ দূর করে;
- লোমকূপের ছিদ্র আটকে যাওয়া প্রতিরোধ করে;
- ত্বকের হারানো ঐজ্জ্বল্য ফিরিয়ে আনে;
ফেসিয়াল মাস্ক কিভাবে ব্যাবহার করতে হয়?
- মুখ ভালভাবে ফেস ওয়াশ কিংবা ক্লিনজার দিয়ে ধুয়ে নিন;
- পণ্যটি কোনো ফেসিয়াল ব্রাশ কিংবা আঙুলের অগ্রভাগ দিয়ে সমগ্র মুখে লাগিয়ে নিন;
- ৩০-৪০ মিনিট অপেক্ষা করুন। ওভারনাইট ধরনের হলে সারারাত রেখে দিন;
- একটি তুলা বা ফেসিয়াল ওয়াইপ পানিতে কিংবা গোলাপজলে ভিজিয়ে নিন;
- তুলা দিয়ে আস্তে আস্তে ওঠানোর চেষ্টা করুন;
- জোরে হ্যাচকা টান দিয়ে ওঠানোর চেষ্টা ভুলেও করবেন না;
- উঠানোর পরএকটি স্ক্রাবার দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলুন;
- আপনার ত্বকের ধরন অনুযায়ী ময়শ্চারাইজার লাগিয়ে নিন;
সতর্কতা
- ব্যাবহারের পূর্বে অবশ্যই শরীরের ছোট কোনো অংশে প্যাচ টেস্ট করে এলার্জিক রিঅ্যাকশন হয় কিনা যাচাই করে নিন;
- ত্বকের ধরন অনুযায়ী পণ্য নির্বাচন করুন;
- নিম্নমানের ও কমদামী পণ্য থেকে দূরে থাকুন;
- ভালো ব্যান্ডের পণ্য ব্যাবহার করুন;
- তোলার সময় আস্তে আস্তে সময় নিয়ে তুলুন;