শুষ্ক ত্বকে লালভাব আর যেকোনো ঋতুতে হুটহাট ফেটে যাওয়ায় রাতের ঘুম উড়ে যাওয়ার অবস্থা? ফাউন্ডেশন ময়শ্চারাইজারসহ ব্যাবহার করেও অক্সিডাইজ হয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে? কোনোভাবেই ফিরে পাচ্ছেন না ত্বকের হারানো উজ্জ্বলতা? ত্বকে স্পর্শ করলেই হয়ে যাচ্ছেন হতাশ!! মেকআপ করে পাচ্ছেন না শান্তি? রুক্ষতায় ত্বকের হাল বেহাল? ঠোটে বারবার ময়শ্চারাইজার ইউজ করেও ঠোট ফেটে যাচ্ছে বারবার? সেরাম থেকে ময়শ্চারাইজার কোনোকিছুতেই পাচ্ছেন না শুষ্কতা থেকে মুক্তি? চলুন আজ সহজ কিছু উপায়ে ত্বকের শুষ্কতা দূরে ভাগানোর ও নিয়ন্ত্রণের জাদুকরী মন্ত্র জেনে নেই-
শুষ্ক ত্বক বলতে কি বোঝায়?
ত্বকের স্বাস্থ্য যদি রুক্ষ, শুষ্ক, নির্জীব হয়ে যায়, আত্মবিশ্বাস আর জৌলুস হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। শুষ্ক ত্বকের লোমকূপের ছিদ্র খুবই ছোট ও আটসাট হয়, ফাউন্ডেশন কিংবা ময়শ্চারাইজার চুম্বকের মত টেনে নিয়ে ত্বকে আশের মত ফ্লেকি পাউডারের মত গুড়ো ত্বকে, চোখের পাপড়িতে, হাতে কিংবা পায়ে এমনকি মাথার স্ক্যাল্পেও দেখা যায়। শুষ্ক ত্বক হচ্ছে ত্বকের রুক্ষ আর্দ্রতাহীন ধরণ যেখানে ত্বকের তেলগ্রন্থি থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে তেল ও ময়শ্চারাইজার উৎপাদন হয় না কিংবা কোনো চর্মরোগের কারণে ত্বকের প্রয়োজনীয় মসৃণতা হারিয়ে যায়। জন্মগতভাবে জেনেটিকভাবে কিংবা বিভিন্ন চর্মরোগ ও পরিবেশের আর্দ্রতার তারতম্যের কারণে, সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মির কারণে, ঠান্ডা আবহাওয়া এবং ক্ষারযুক্ত সাবানের ক্ষতিকারক প্রভাবে ত্বকের প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা হারিয়ে ত্বক হয়ে যায় শুষ্ক, নির্জীব ও প্রাণবন্ত।
কিভাবে বুঝবেন আপনার ত্বক শুষ্ক?
ত্বকের শুষ্কতার কিছু সুপরিচিত লক্ষণ রয়েছে যা দেখে আপনি বুঝতে পারবেন আপনার ত্বক শুষ্ক ও নির্জীব। চলুন জেনে নেই লক্ষণগুলো-
- চুলকানি;
- গালে লালভাব;
- রুক্ষতা ও শুষ্কতা;
- ত্বকের ছোট ছোট জায়গায় আশের মত চামড়া ওঠা;
- ছোট ছিদ্রযুক্ত লোমকূপ;
- ত্বকের ফেটে যাওয়া;
- ত্বকের আটসাটভাব;
- স্কেলিং;
- ফ্লেকি ত্বক;
- ত্বকের টোনের তারতম্য;
- মেকআপ দ্রুত শুকিয়ে যাওয়া;
- ত্বকের ময়শ্চারাইজার দ্রুত শোষিত হয়ে যাওয়া;
- ত্বকের জৌলুস হারিয়ে মলিনতা ও ফ্যাকাশে ভাব হওয়া;
ত্বক শুষ্ক হওয়ার কারণসমূহঃ
ত্বক শুষ্কতার জন্য বিভিন্ন কারন থাকতে পারে। বাংলাদেশের আবহাওয়ায় ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়ার প্রধান কারণসমুহ চলুন জেনে নেই-
- বার্ধক্যজনিতকারণে অর্থাৎ বয়স ৪০ এর বেশি হয়ে গেলে ত্বক রুক্ষ হয়ে যায়;
- অতিরিক্ত গরম কিংবা সূর্যের তীর্যক তাপে দীর্ঘসময় থাকতে হয় এমন পেশায় নিয়োজিত থাকলে;
- কম আর্দ্রতাসম্পন্ন পরিবেশে বসবাস করলে;
- দীর্ঘসময় যাবৎ গরম পানিতে গোসল করলে;
- ক্লোরিনযুক্ত পানিতে যেমন-সুইমিং পুলে দীর্ঘক্ষন গোসল করলে;
- অধিক ক্ষারযুক্ত সাবান কিংবা ক্ষতিকারক উপাদানযুক্ত পণ্য;
- ঘন ঘন হাত ও মুখমণ্ডল ধোয়া;
- অতিরিক্ত মানসিক চাপ;
- ডিপ্রেশন অর্থাৎ বিষন্নতা;
- এলার্জিপ্রবণ ত্বক;
- সংবাদনশীল ত্বক;
- মারাত্মক ও জটিল চর্মরোগ;
- হাইপোথাইরয়েডিজম, ডায়াবেটিস বা অপুষ্টিজনিত রোগ;
- পরিবেশের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার তারতম্য;
- বংশগতভাবে অর্থাৎ জন্মগতভাবে শুষ্ক ত্বক পাওয়া;
শুষ্কতা দূর করতে যে কাজগুলো অবশ্যই করবেন
- অতিরিক্ত গরম পানিতে গোসল করা যাবেনা। উষ্ণ গরম পানি ব্যাবহার করতে পারবেন;
- দীর্ঘসময় যাবৎ গোসল করা যাবে না;
- প্রতিবার ত্বক পরিষ্কারের পর ময়শ্চারাইজার ব্যাবহার করুন;
- পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে;
- ভিটামিন-সি যুক্ত খাবার খাওয়া;
- তীব্র রোদে বের হবেন না;
- বাইরে বের হওয়ার আগে সানব্লক বা সানস্ক্রিন ক্রিম ব্যাবহার করবেন;
- ত্বক যাতে রোদে পুড়ে ট্যান বা কালচে ভাব না হতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখবেন;
- গোসলের সময় ময়শ্চারাইজারসম্পন্ন সাবান ব্যাবহার করা;
- বাংলাদেশী আবহাওয়া উপযোগী উন্নতমানের শুষ্ক ত্বকের জন্য তৈরীকৃত মেকআপ পণ্য ব্যাবহার করা;
- শীতকালে ত্বক কোমল রাখতে পর্যাপ্ত ময়শ্চারাইজার ব্যাবহার করা;
- এসেনসিয়াল অয়েল ত্বকে ব্যাবহার করা;
শুষ্ক ত্বক থেকে মুক্তি পেতে খাদ্যাভাসে যেসব পরিবর্তনগুলো আনা উচিত
- ক্যাফেইন থেকে বিরত থাকুন;
- চিনি কিংবা নোনতা খাবার গ্রহন থেকে বিরত থাকুন;
- অ্যালকোহল গ্রহণ থেকে বিরত থাকুন;
- অধিক পরিমানে পানি পান করুন;
- বেশি বেশি ভিটামিন সি জাতীয় ফল ও খাদ্য গ্রহণ করুন;
- শুষ্কতা দূর করতে সাহায্য করে এমন খাবার যেমন- কড লিভার অয়েল, অলিভ অয়েল, হালকা মিষ্টি জাতীয় খাবার, লাল মরিচ(সীমীত পরিমাণে), গরুর মাংস, বেশি বেশি প্রোটিনযুক্ত খাবার, সূর্যমুখী ফুলের বীজ, কিউই ফল, সয়া, বাদাম এবং ওট মিল্ক ইত্যাদি খাবার গ্রহণ করুন যা ত্বকীয় শুষ্কতা দূর করতে সাহায্য করে।
শুষ্ক ত্বকে কি কি চর্মরোগ হতে পারে?
কন্টাক্ট ডার্মাটাইটিস: ত্বক যখন ভারী গয়না, ধাতু বা নিকেল, ক্ষতিকর মেকআপ পণ্য, সস্তা ক্ষতিকারক পণ্য, অধিকক্ষারযুক্ত ডিটারজেন্ট, কিংবা কোনো সংবেদনশীল উপাদানসম্বলিত ওষুধের সংস্পর্শে আসে, তখন ত্বকে এই ধরনের শুষ্কতা দেখা দেয় যা পরবর্টিতে চর্মোরোগে রূপ নেয়।
সেবোরিক ডার্মাটাইটিস: সেবোরিক ডার্মাটাইটিস হচ্ছে খুশকির সবচেয়ে মারাত্মক রুপ। আপনার শরীরের শুষ্কতাস, রুক্ষতা আর্দ্রতা হারানো এবং ফ্ল্যাকি ত্বকের কারণে এই জটিল চর্মরোগ হতে পারে। এটি আপনার মুখ, বুকে, হাতে, পায়ে, এমনকি মাথার স্ক্যাল্পেও হতে পারে। এটি গুরুতর পর্যায়ে গেলে পুজভর্তি বেদনাদায়ক ও প্রদাহজনিত ব্রণ হতে পারে।
একজিমা: কোনো প্রসাধনী বা পণ্যের ব্যাবহার অথবা কোনো বিশেষ কারনে যদি ত্বকে লালভাব , র্যাশের মত ফুসকুড়ি ,শুষ্কতা, জালাপোড়া এবং চুলকানি হয়। কখনও কখনও একজিমার সংক্রমণের মাত্রা বেড়ে ত্বকে ইনফেকশন ঘটাতে পারে এবং রক্তে অ্যালার্জেনের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে।
অ্যাথলেটস ফুট: মাইক্রোস্পোরাম নামক ছত্রাক এবং বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের কারণে কিংবা সোরিয়াসিসে আক্রান্ত ব্যাক্তিদের ক্ষেত্রে, ভেজা অপরিচ্ছন্ন নখ, খালি পায়ে হাটা প্রভৃতি নানা কারণে এই রোগ হতে পারে।এটি পায়ের ত্বকে শুষ্কতার কারণে হয়।দাদ নামক ছত্রাকের কারণে এটি হয়ে থাকে। যখন এই ছত্রাক আপনার শরীরে বৃদ্ধি পায়, তখন এটি আপনার পায়ে শুষ্কতা,চুলকানি ও প্রদাহ তৈরী করে থাকে। পায়ের মাঝখানের ভাজগুলোতে লাল ক্ষুদ্র ফসকুড়ি ও মাছের আশের মতো পায়ের মৃত চামড়া উঠে আসতে দেখা যায়। পায়ে ঘা অথবা পায়ের আঙুলের ফাকে ফাকে ফোস্কা হতে পারে। আক্রান্ত ব্যাক্তির পায়ের নখগুলো ভঙ্গুর ও ঝুরঝুরে কিংবা ফেটে যেতে পারে।